Ajker Patrika

টানেল থেকে বেরিয়ে সব অবাস্তব লাগছিল বেঁচে ফেরা নেপালি শ্রমিকের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
টানেল থেকে বেরিয়ে সব অবাস্তব লাগছিল বেঁচে ফেরা নেপালি শ্রমিকের
বেঁচে ফেরার পর স্ত্রীর সঙ্গে ধন বাহাদুর তামাং। ছবি: সংগৃহীত

চীন সীমান্তবর্তী নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ টানেলে ভয়াবহ বন্যার ঢেউ আঘাত হানার পর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ৩২ বছর বয়সী ধন বাহাদুর তামাং। তিনি আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সহায়ক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন।

তামাং জানান, গত সপ্তাহে টানেলের ভেতরে কাজ করার সময় হঠাৎ বাতাসের চাপের পরিবর্তন অনুভব করেন তিনি। কারখানার শক্তিশালী বাতির নিচে চারদিকে ধুলো উড়তে শুরু করে। তখনই তাঁর মনে হয়, ‘কিছু একটা আসছে।’

কিছু বুঝে ওঠার আগেই টানেলে ঢুকে পড়ে প্রবল বন্যার পানি। ততক্ষণে ত্রিশূলি নদীর উজানে বন্যার ভয়াবহ স্রোত পুরো জনপদ তছনছ করে ফেলেছে। পরে সেই ধ্বংসাত্মক ঢেউ উপত্যকা দিয়ে নেমে আসে। এই দুর্যোগে নেপালে ১ হাজার ২৫২ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

তামাং বলেন, দুর্ঘটনার সময় প্রকল্প এলাকায় সম্ভবত কয়েক শ মানুষ ছিলেন। হঠাৎ সবাই চিৎকার, দৌড় ও ছোটাছুটি করতে শুরু করেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি একটি ট্যাংকার ট্রাকের ওপর উঠে পড়েন। পানি ঢুকে পড়লে গাড়িটিও নড়তে শুরু করে। তাঁর বারবার মনে হচ্ছিল, তিনি এখনই মারা যাবেন।

জীবন বাঁচাতে টানেলের পাইপ আঁকড়ে ধরেন তামাং। কখনো পাইপের ওপর উঠে, কখনো যা হাতের কাছে পেয়েছেন তা ধরে মাথা পানির ওপরে রাখার চেষ্টা করেন। এতে তাঁর এক পা জখম হয়।

সেই ভয়াবহ সময়ে বারবার পরিবারের কথা মনে পড়ছিল তাঁর। মা-বাবা ও প্রিয়জনদের কথা ভেবে তিনি চিৎকার করে কাঁদছিলেন।

পানির স্রোত কিছুটা কমলে তিনি দেখেন, আরও কয়েকজন বেঁচে আছেন। তারা টানেলের প্রবেশপথের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ধ্বংসাবশেষে পথ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে টানেলের আরও গভীরের দিকে এগিয়ে যান।

অন্ধকারে এগোতে গিয়ে তাঁরা একের পর এক মরদেহ দেখতে পান। অনেকে আহত হয়ে নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে অনেকে ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলেন।

টানেলের ভেতর তখন প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকার। জীবিতরা একে অপরের হাত ধরে, একটি মাত্র টর্চের আলো অনুসরণ করে ধ্বংসাবশেষ, পানি ও মরদেহের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। তামাংয়ের ভাষায়, সেটি ছিল ‘অন্ধকারের ভেতর দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর লড়াই’।

অবশেষে তাঁরা টানেল থেকে বেরিয়ে আলোর মুখ দেখেন। বাইরে এসে সেই আলো তাঁদের কাছে অবাস্তব মনে হচ্ছিল। স্থানীয়রা তাঁদের শুকনো কাপড় দিয়ে সহায়তা করেন। তবে ঘন কুয়াশার কারণে হেলিকপ্টার চলাচল ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম ধীর গতিতে এগোয়।

পরে স্থানীয় গ্রামবাসীর সহায়তায় পরিবারের কাছে ফেরেন তামাং। হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয় তাঁকে। স্ত্রীকে দেখার পর দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তামাং জানান, ফিরে আসার পরও রাতে দুঃস্বপ্ন দেখছেন। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে টানেলের অন্ধকার, পানি ও মৃত সহকর্মীদের দৃশ্য।

এই অভিজ্ঞতার পর তাঁর সিদ্ধান্ত স্পষ্ট—আর কখনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ টানেলে কাজ করবেন না। তিনি বলেন, ‘আমি ভাগ্যকে আর পরীক্ষা করতে চাই না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত