Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান: সামরিক সক্ষমতায় কে এগিয়ে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান: সামরিক সক্ষমতায় কে এগিয়ে

দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আর কূটনৈতিক ব্যর্থতার অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দাবানলে জ্বলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ঘোষণার পর তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলো এখন মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে প্রকম্পিত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক বিমান হামলা, আর অন্যদিকে ইরানের ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’র পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করছে। এই দুই শক্তির সংঘাত আজ কেবল একটি সামরিক মহড়া নয়, বরং একটি রক্তক্ষয়ী বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের এক নম্বর সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি ইরানের সামরিক সক্ষমতার তুলনা করা কেবল সংখ্যার বিচার নয়, বরং এটি দুই ভিন্ন ধরণের যুদ্ধকৌশলের লড়াই। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ২০২৬-এর সূচকে ১৪৫টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে অবস্থান করছে, আর ইরান ১৬তম স্থানে থেকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।

বিমান শক্তি

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ হলো তাদের বিমানবাহিনী। ১৩ হাজারেরও বেশি বিমানের বিশাল বহর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের ১ হাজার ৭৯১টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং ১,০০০টির বেশি অ্যাটাক হেলিকপ্টার যেকোনো দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেঙে দিতে সক্ষম। বিশেষ করে তাদের এফ-৩৫ এবং বি-২১ এর মতো স্টিলথ প্রযুক্তি তাদের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

অন্যদিকে, ইরানের বিমান বাহিনী সংখ্যার বিচারে অনেক পিছিয়ে, মাত্র ৫৫১টি যুদ্ধবিমান। ইরানের অধিকাংশ যুদ্ধবিমানগুলো পুরনো প্রজন্মের। তবে এই ঘাটতি কাটাতে ইরান বিনিয়োগ করেছে তাদের ড্রোন বা ইউএভি প্রযুক্তিতে। ইরানের ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোনগুলো বর্তমানে আধুনিক যুদ্ধের এক আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত কম খরচে শত্রুপক্ষের দামি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পারে।

স্থল শক্তি ও আর্টিলারির

স্থলযুদ্ধের ক্ষেত্রে ইরান একটি শক্ত প্রতিপক্ষ। ইরানের কাছে প্রায় ১ হাজার ৯৯৬টি ট্যাংক এবং ৬৫ হাজারেরও বেশি সাঁজোয়া যান রয়েছে। তবে ইরানের আসল শক্তি হলো তাদের রকেট প্রজেক্টর বা এমএলআরএস। প্রায় ১ হাজার ৫৫০টি রকেট লঞ্চার নিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো অবস্থানে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করতে সক্ষম।

বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থল শক্তি মূলত গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ৪ হাজার ৬৫০টি আব্রামস ট্যাংক এবং ৩ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব। আধুনিক লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল বাহিনী অনেক বেশি গতিশীল।

নৌশক্তি ও কৌশলগত অবস্থান

নৌ-শক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১১টি বিশাল বিমানবাহী রণতরী এবং ৮৩টি ডেস্ট্রয়ার। এটি একটি ‘ব্লু ওয়াটার নেভি’, যা গভীর সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। ৬৬টি সাবমেরিন নিয়ে মার্কিন নৌবাহিনী পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে হামলা চালাতে সক্ষম।

ইরানের নৌ-সক্ষমতা মূলত ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাদের ১০৯টি যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সাবমেরিন এবং ছোট দ্রুতগামী গানবোটের সংখ্যা বেশি। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর মতো সংকীর্ণ জায়গায় এই ছোট বোটগুলো বিশাল মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। ইরান সরাসরি নৌ-যুদ্ধে না গিয়ে মাইন বা টর্পেডো ব্যবহারের মাধ্যমে সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করার কৌশল নিয়ে চলে।

আর্থিক সামর্থ্য ও টেকসই ক্ষমতা

যেকোনো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার প্রধান জ্বালানি হলো অর্থ। এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ব্যবধান অকল্পনীয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৮৩১ বিলিয়ন ডলার, যা ইরানের বাজেটের (৯ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে প্রায় ৯০ গুণ বেশি। বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ প্রযুক্তির যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। অন্যদিকে, ইরান বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও তাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে সামরিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করেছে, তবে সেগুলো আত্মরক্ষণাত্মমূলক।

ভৌগোলিক সুবিধা ও জনবল

ইরানের ভূ-প্রকৃতি পাহাড়ি এবং রুক্ষ, যা যেকোনো বিদেশি বাহিনীর জন্য স্থল অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। দেশটির প্রায় ৬ লক্ষ সক্রিয় সৈন্য এবং ১০ লক্ষেরও বেশি আধা-সামরিক বাহিনী (বাসিজ ও আইআরজিসি) নিজ দেশের মাটিতে জীবন দিয়ে লড়তে প্রস্তুত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রকে লড়তে হয় সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে, যা তাদের জন্য বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ।

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের বিবরণ অনুযায়ী, প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্রের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিরোধ্য। তবে ইরান তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, ড্রোন প্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এক কথায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি হয় ‘অপ্রতিরোধ্য তরবারি’, ইরান তবে একটি ‘দুর্ভেদ্য ঢাল’।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা: ফের আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসন: এমপি হতে ২৯ নেত্রীর দৌড়ঝাঁপ

অভিনেতা যাহের আলভীর স্ত্রীর আত্মহত্যা

পরমাণু বোমা তৈরির মতো ইউরেনিয়াম মজুত করবে না ইরান, চুক্তির দ্বারপ্রান্তে তেহরান-ওয়াশিংটন

মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত