Ajker Patrika

ইরান সংকটে মধ্যস্থতার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার চাইল পাকিস্তান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান সংকটে মধ্যস্থতার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার চাইল পাকিস্তান
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ছবি: এক্স

ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখছে পাকিস্তান। জানা গেছে, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীলতা তহবিল (এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্যাসিলিটি) চেয়েছে পাকিস্তান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য এটি বড় ধরনের সহায়তা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের কাছে পাঁচ বছর পর্যন্ত মেয়াদের ১০ বিলিয়ন ডলারের ‘দ্বিপক্ষীয় এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন সাপোর্ট ফ্যাসিলিটি’ গঠনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই তহবিল অনুমোদিত হলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে, রুপির ওপর চাপ কমবে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের ওপর নির্ভরতা কিছুটা হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় চলমান কঠোর রাজস্ব ও মুদ্রানীতি বাস্তবায়নও সহজ হবে।

তবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বা পাকিস্তান অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব। পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে তিনি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতির ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তবে সেখানে ১০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের অনুরোধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আওরঙ্গজেব আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে পাকিস্তানের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং দেশের সার্বভৌম ঋণমান উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়েছেন। এ ছাড়া উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

কেন প্রয়োজন এই তহবিল

বর্তমানে পাকিস্তান আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় কর বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় কমানো এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্যাসিলিটি খুবই বিরল ধরনের আর্থিক সহায়তা। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’-এর মাধ্যমে এ ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে ডলার, মুদ্রা বিনিময় (সোয়াপ) বা গ্যারান্টি দেওয়া হয়।

এ ধরনের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের স্থায়ী ডলার সোয়াপ লাইনের মতো নয়। এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ডলারের জরুরি সহায়তা হিসেবে কাজ করে।

২০২৫ সালে আর্জেন্টিনার জন্য দেওয়া সহায়তা ছিল ২০০২ সালে উরুগুয়ের পর প্রথম নতুন বৈদেশিক সরকারভিত্তিক এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্যাসিলিটি। এর বাইরে শুধু মেক্সিকোর সঙ্গে ১৯৪০-এর দশক থেকে চালু একটি স্থায়ী সোয়াপ লাইন রয়েছে, যার বর্তমান আকার ৯ বিলিয়ন ডলার।

পাকিস্তান এখনো বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল

২০২৩ সালে ৩ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ স্ট্যান্ডবাই চুক্তির মাধ্যমে খেলাপি হওয়া থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায় পাকিস্তান। পরে দেশটি আইএমএফের কাছ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের ‘এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি’ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে আরও ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পৃথক ঋণ পায়।

তবু পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো সরকারি অর্থায়ন, ঋণ নবায়ন এবং চীন ও সৌদি আরবের আমানতের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বা আইএমএফের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে পাকিস্তান বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে।

চলতি বছরের এপ্রিলে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করে পাকিস্তান, যা সে সময় দেশটির মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ ছিল। পরে সৌদি আরব নতুন করে ৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারিতে জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তানকে এই তহবিল দেয়, তবে সেটি শুধু তারল্য সহায়তাই হবে না; বরং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও দেবে। এতে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রুপির ওপর চাপ কমবে এবং আইএমএফের কিস্তি বা জরুরি আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।

তবে আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করলেও এর রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে পাকিস্তানকে। কর বৃদ্ধি, ব্যয় সংকোচন এবং উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে গেছে।

রেটিং সংস্থা ফিচ গত এপ্রিলে এক প্রতিবেদনে বলেছিল, আইএমএফ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কারণে পাকিস্তানের অর্থায়নের সক্ষমতা বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় সহায়ক। তবে ফিচ সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যেতে পারে।

বিনিয়োগ টানতে চায় ইসলামাবাদ

ঘন ঘন বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ঝুঁকি, অতীতে মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার বিধিনিষেধ এবং সীমিত রপ্তানিভিত্তির কারণে পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ এখনো কম। এ ছাড়া দেশটির ঋণমান এখনো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার খরচও বেশি।

এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে পাকিস্তান। ইতিমধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি, রিয়েল এস্টেট ও খনিজ খাতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এগিয়েছে।

পাকিস্তান ট্রাম্প পরিবারের প্রধান ক্রিপ্টো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সীমান্ত-পার লেনদেনের জন্য স্টেবলকয়েন-সংক্রান্ত একটি চুক্তিও করেছে। এ ছাড়া নিউইয়র্কে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) মালিকানাধীন বন্ধ রুজভেল্ট হোটেল পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে রেকো ডিক খনিসহ বিভিন্ন খনিজ প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামাবাদ। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক রেকো ডিক প্রকল্পে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত