সুদানের গৃহযুদ্ধে কলম্বিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধা এনেছিল আমিরাত: জাতিসংঘ

সুদানের গৃহযুদ্ধে দেশটির আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) হয়ে লড়তে কলম্বিয়া থেকে ভাড়াটে যোদ্ধা এনেছিল আরব সংযুক্ত আমিরাত। পাশাপাশি এই যোদ্ধাদের অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণেও সহায়তা দিয়েছে দেশটি। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত আরএসএফের সামরিক অভিযানে এসব যোদ্ধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্লুমবার্গের হাতে আসা জাতিসংঘের সুদানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একটি গোপন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতভিত্তিক একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কলম্বিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধাদের নিয়োগ করেছিল। তাঁদের আরএসএফের পক্ষে লড়াইয়ের জন্য পাঠানো হয়। এ ছাড়া সোমালিয়ায় আমিরাত-সংশ্লিষ্ট একটি ঘাঁটি ব্যবহার করে তাঁদের পরিবহন ও সম্ভাব্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গত সপ্তাহে প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতভিত্তিক বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিকিউরিটি সার্ভিসেস গ্রুপ (জিএসএসজি) কলম্বিয়ার যোদ্ধাদের নিয়োগ করেছিল—এ বিষয়ে তদন্তকারীরা ‘নিশ্চিতভাবে’ তথ্য পেয়েছেন। যোদ্ধাদের সুদানে পাঠানোর আগে সোমালিয়ার বসাসোতে অবস্থিত আমিরাত-সংশ্লিষ্ট পুন্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্সের ঘাঁটিতে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে তাঁদের যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং সম্ভবত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
তবে সুদানের গৃহযুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছে আমিরাত। গত শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জিএসএসজি-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো আমিরাতের কর্তৃপক্ষ তদন্ত করেছে এবং তদন্তের ফল জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলকে জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সুদানে আমিরাত কোনো অস্ত্র বা সামরিক সহায়তা দেয়নি। বরং দেশটি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করে আসছে।
জাতিসংঘের তদন্তে বলা হয়েছে, দারফুর অঞ্চলে আরএসএফের সামরিক অভিযানে কলম্বিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে সুদানের এল ফাশের শহর অবরোধ ও দখল অভিযানে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল। ওই অবরোধ প্রায় ১৮ মাস স্থায়ী হয়েছিল।
এল ফাশেরে ব্যাপক নৃশংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে আগেই জানিয়েছিল জাতিসংঘ। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, মাত্র তিন দিনে শহরটিতে প্রায় ছয় হাজার মানুষ নিহত হন। কলম্বিয়ার যোদ্ধারা ড্রোন, কামান এবং পদাতিক বাহিনীকে সহায়তা দেওয়ার মতো কাজে যুক্ত ছিলেন।
২০২৩ সালে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে সংঘাতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততায় এই সংঘাত একপর্যায়ে প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নেয়। আরএসএফকে আমিরাতের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে নতুন প্রতিবেদনটি আরও প্রমাণ যোগ করল।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব পদে প্রার্থী হওয়ার প্রচার চালাচ্ছেন আমিরাতের শীর্ষ কূটনীতিকদের একজন লানা নুসেইবেহ। সুদানের যুদ্ধে আমিরাতের ভূমিকার অভিযোগ তাঁর প্রার্থিতাকে জটিল করে তুলতে পারে। এরই মধ্যে জাতিসংঘে সুদানের প্রতিনিধিরা তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করে আসছেন নুসেইবেহ। জাতিসংঘে আমিরাতের রাষ্ট্রদূত থাকাকালে নিরাপত্তা পরিষদে তিনি বলেছিলেন, আরএসএফকে আমিরাতের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন, অসত্য এবং প্রমাণবিহীন’।
জাতিসংঘের মহাসচিব পদে প্রার্থিতা ঘোষণার পরও সুদানের যুদ্ধকে নিজের অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। নুসেইবেহ বলেছেন, এই সংঘাতের অবসান পরবর্তী মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হবে।
জাতিসংঘ প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সুদানের পরিস্থিতি ভয়াবহ। মহাসচিব হলে এই ভয়াবহ সংঘাতের অবসান ঘটানো আমার অগ্রাধিকারগুলোর একটি হবে।’ তবে জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনটি তিনি দেখেননি বলেও জানান।
নুসেইবেহ আরও বলেন, জাতিসংঘের তদন্তে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা তাঁর দায়িত্ব হবে।
প্রসঙ্গত, এর আগে নিউইয়র্ক টাইমস জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের এসব তথ্য প্রকাশ করেছিল।











