Ajker Patrika

ক্ষুধা, ক্লান্তি ও বৈরিতায় ভেঙে পড়ল মরক্কানদের স্পেনে নতুন জীবনের স্বপ্ন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ক্ষুধা, ক্লান্তি ও বৈরিতায় ভেঙে পড়ল মরক্কানদের স্পেনে নতুন জীবনের স্বপ্ন
ছবি: রয়টার্স

সাঁতরে ও সীমান্তের বেড়া টপকে স্পেনের আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় ঢুকে পড়া মরক্কান অভিবাসীরা গতকাল শনিবার থেকে আবার নিজ দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। তাদের অনেকেই বলেছেন, ক্ষুধা, চরম ক্লান্তি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বৈরী আচরণ ইউরোপে নতুন জীবন শুরুর আশা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে।

যারা ফিরে যাচ্ছেন, তারা রয়টার্সকে বলেছেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বন্ধুদের পাঠানো বার্তায় তারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। এসব ভিডিও ও বার্তায় বলা হয়েছিল, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত সীমান্তও পার হওয়া সম্ভব। কিন্তু সেউতায় পৌঁছানোর পর অনেকেই দেখেন, সেখান থেকে মূল স্পেনের দিকে যাওয়ার কোনো পথ নেই।

মরক্কোর ফেজ শহরের একটি বেকারিতে কাজ করতেন ব্রাহিম। হাজার হাজার মানুষ একইভাবে সীমান্ত পার হচ্ছে, এমন ভিডিও দেখার পর তিনি চাকরি ছেড়ে সীমান্ত পার হন। তিনি বলেন, ‘আমরা এগিয়ে যেতে এসেছিলাম, প্রতারিত হতে নয়। আমি ভেবেছিলাম সেখানে গিয়ে আরও ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করব। কিন্তু সেউতায় এসে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’

ব্রাহিম জানান, তিন দিন তিনি শুধু পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন। স্পেনের অংশে খাবারের দাম এত বেশি ছিল যে তা কেনার সামর্থ্যও তার ছিল না। তিনি বলেন, ‘একটা টুনা স্যান্ডউইচের দাম ১০০ দিরহাম (১০.৭৫ ডলার) কীভাবে হতে পারে?’

‘সেউতা যেন একটা কারাগার ছিল’

সেউতার বিপরীত দিকে থাকা মরক্কোর শহর ফনিদেকে রয়টার্স সীমান্তের দিকে যাওয়া প্রায় জনশূন্য রাস্তা দেখতে পেয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। সেই তুলনায় শনিবার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তরুণেরা সীমান্ত এলাকা থেকে মহাসড়ক ধরে দূরে চলে যাচ্ছিলেন। কেউ কেউ আবার ফনিদেক থেকে বের হওয়ার জন্য ট্যাক্সির অপেক্ষা করছিলেন। শহরের অনেক দোকানও কয়েক দিন ধরে বন্ধ ছিল।

ফিরে আসা অভিবাসীদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, সুপারমার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় তারা খাবার ও পানির সন্ধানে ঘুরেছেন। অনেকের কাপড় পানিতে ভিজে গিয়েছিল এবং তারা রাস্তায় দাঁড়িয়েই সেই কাপড় শুকিয়েছেন।

মরক্কোর টাঙ্গের মেড বন্দরে কাজ করা এক শ্রমিক বলেন, ‘সেউতা যেন একটা কারাগার ছিল। সেখানে করার মতো কিছুই ছিল না। সবকিছু বন্ধ ছিল।’ তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি, কারণ তাঁকে আবার কাজে ফিরতে হচ্ছিল।

কিছু অভিবাসনপ্রত্যাশী আরও অভিযোগ করেছেন, সেউতার প্রধানত মরক্কান বংশোদ্ভূত বাসিন্দাদের এল প্রিন্সিপে এলাকার মানুষ তাদের মারধর করেছেন অথবা সেখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। রয়টার্স এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। মরক্কোর ওয়েটার ইয়াসিন ইচু বলেন, তাঁকে এল প্রিন্সিপে এলাকায় মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের সেউতা ছেড়ে নিজেরাই চলে যেতে বাধ্য করার জন্য অবরোধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল...তারা তাদের পরিকল্পনায় সফল হয়েছে।’ তিনি ব্যাপকভাবে দোকানপাট বন্ধ রাখার ঘটনাকে এর সঙ্গে যুক্ত করেন।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুটি পৃথক ছুরি হামলার ঘটনায় দুজন সামান্য আহত হয়েছেন এবং হামলাকারীদের একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের পর সেউতায় ছুরি হামলায় কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

সীমান্তের কাছে ফনিদেকের একটি হোটেলে কাজ করেন রাশিদ। তিনি জানান, অভিবাসীদের ঢল যখন সবচেয়ে বেশি ছিল, তখন হোটেলের রান্নাঘরের ছয় কর্মীই সেউতায় চলে গিয়েছিলেন। তাদের কেউই ফিরে আসেননি। ফলে হোটেল কর্তৃপক্ষকে নতুন কর্মী খুঁজতে হচ্ছে।

তরুণ অভিবাসীদের জন্য কিছুটা সহানুভূতিও

সীমান্তের ওপারে সেউতায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ক্যাফেগুলো আবার খুলেছে এবং সেখানে ক্রেতাদের ভিড়ও দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ দোকান এখনো বন্ধ। নিরাপত্তার দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখাতে পুলিশের টহল গাড়িগুলো রাস্তায় ঘুরছে। ২৪ বছর বয়সী মারিনা কাস্তানো বলেন, তাঁর বাবা-মা শহরের কেন্দ্রে দুটি ক্যাফের মালিক। তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত জীবনকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতেই হবে, তাই আমরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে দোকান খুলেছি। তবে আমাদের এবং আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তাই সবসময় অগ্রাধিকার।’

তবে কিছু বাসিন্দা বলেছেন, শহরের বাইরের এলাকাগুলোতে এখনো পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। একটি অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্রে কর্মরত এক ত্রাণকর্মী জানান, কেন্দ্রটি পুরোপুরি ভর্তি হয়ে গেছে এবং নতুন করে আর কাউকে নেওয়ার মতো জায়গা নেই। তার ধারণা, এখনো হাজার হাজার অভিবাসী সেউতার ভেতরে রয়েছেন।

হার্ডওয়্যারের দোকানের মালিক টিটোর দোকান তখনো বন্ধ ছিল। তিনি বলেন, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের হঠাৎ আগমনে স্থানীয় বাসিন্দারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তবে একই সঙ্গে তাদের প্রতি সহানুভূতিও তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আপনি একই সময়ে নিজেকে অসহায় এবং বিপর্যস্ত মনে করেন। ওই তরুণদের পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’

‘আমি ফিরে যাচ্ছি না’

৪৩ বছর বয়সী সুদানি নাগরিক মোহাম্মদ আহমেদ জানান, একটি ট্রাক তাঁকে এবং আরও কয়েকজন অভিবাসীকে সীমান্তের কাছে নামিয়ে দিয়েছিল। এরপর তিনি চার ঘণ্টা সাঁতার কেটে সেউতায় পৌঁছান। তিনি বলেন, পুলিশ তাদের অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্রের দিকে যাওয়ার রাস্তা আটকে দিচ্ছিল। তারপরও স্পেনে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মোহাম্মদ আহমেদ বলেন, ‘আমি ফিরে যাচ্ছি না। এখানে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে মরতে হলেও আমি রাজি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত