দ্বৈত চাপে বাংলাদেশ

বিংশ শতাব্দীর শেষে (১৯৯৯ সাল পর্যন্ত) বাংলাদেশে জীবাণুঘটিত সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। অন্যদিকে একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ডায়াবেটিস, কিডনি ও হৃদ্রোগের মতো অসংক্রামক রোগের প্রকোপ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে দেশে অসুস্থতায় মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ঘটে অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে। এর সঙ্গে বিভিন্ন সময় সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই সমান্তরাল রোগের উপস্থিতিকে ‘ডাবল বার্ডেন অব ডিজিজ’ বা ‘রোগের দ্বৈত বোঝা’ বলে ব্যাখ্যা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বহু ওষুধ প্রতিরোধী (এমডিআর) জীবাণুর বিস্তারের বিষয়টিও।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে রোগের অবস্থার রূপ বদলেছে। তিন দশক আগে যেসব সংক্রামক রোগ জনস্বাস্থ্যের প্রধান হুমকি ছিল, টিকা কর্মসূচির সফলতায় সেগুলোর বেশির ভাগই এখন নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে দ্রুত বেড়েছে অসংক্রামক রোগ। তবে মাঝেমধ্যে সংক্রামক রোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে বলে একসঙ্গে দুই ধরনের রোগের চাপ রয়েছে।
সংক্রামক রোগপ্রতিরোধে অগ্রগতি
সংক্রামক রোগপ্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। একসময় শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ ডায়রিয়া এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। কলেরা হ্রাস পেয়েছে। টাইফয়েড ও শিগেলোসিস বিদ্যমান থাকলেও নিয়ন্ত্রিত। যক্ষ্মা (টিবি) নির্মূল না হলেও শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা বেড়েছে। ম্যালেরিয়া মূলত পাহাড়ি এলাকায় সীমিত। কালাজ্বর নির্মূল হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির ফলে ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি ও টিটেনাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পোলিও নির্মূল হয়েছে। হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ কিছুটা কমেছে। র্যাবিসের প্রকোপ কমেছে।
অন্যদিকে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে ডেঙ্গু ও হাম। চিকুনগুনিয়া নতুনভাবে দেখা দিয়েছে। বাদুড়বাহিত ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের সংক্রমণ এখনো খুব সীমিত হলেও প্রাণঘাতী।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার। বিষয়টি চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে ২০০৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (১৯৮৬-২০০৬) দেখা যায়, চাঁদপুরের মতলবে মৃত্যুর ধরনে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। সংক্রামক তথা পরজীবীঘটিত রোগ থেকে সমস্যা অসংক্রামক ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে রূপ নিয়েছে। সে সময় হৃদ্রোগ ও মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগে মৃত্যু ৩,৫২৭ শতাংশ এবং ক্যানসারে মৃত্যু ৪৯৫ শতাংশ বেড়েছিল। গবেষকেরা একে মহামারি পর্যায়ের রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে মোট মৃত্যুর মাত্র ৮ শতাংশ ছিল অসংক্রামক রোগে। আর সংক্রামক রোগে মৃত্যু ছিল ৫২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু বেড়ে হয় ৪১ শতাংশ। ২০০৬ সালে মোট মৃত্যুর ৬৮ শতাংশই হয় অসংক্রামক রোগে। আর সংক্রামক রোগে মৃত্যু নেমে আসে ১১ শতাংশে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী গ্লোবাল সায়েন্স রিসার্চ জার্নালসে ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের ‘ডাবল বার্ডেন অব ডিজিজ’ বর্তমানে বাংলাদেশসহ অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। আর্থিক উন্নতির পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, দুর্বল স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং বংশগত প্রবণতা অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগের দ্বৈত বোঝা মোকাবিলার মূল কৌশল হলো জীবনচক্রজুড়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—সব স্তরে সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করা। বাংলাদেশ এখন এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংক্রামক রোগ, অপুষ্টি ও মাতৃস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা কমে ধীরে ধীরে অসংক্রামক রোগ প্রধান সমস্যা হয়ে উঠছে। আবার সংক্রামক রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নতুন ও পুনরুত্থিত সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব
২০০৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পূর্বাভাস দিয়েছিল, স্বাস্থ্যচিত্রের রূপান্তরের ফলে আগামী দুই দশকে বিশ্বের স্বাস্থ্য চাহিদায় নাটকীয় পরিবর্তন ঘটবে। ২০২০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল অঞ্চলে প্রতি ১০টি মৃত্যুর মধ্যে ৭টির জন্য অসংক্রামক রোগ দায়ী হবে।
ওই পূর্বাভাস বর্তমানে বাস্তব হতে দেখা যাচ্ছে বলে ডব্লিউএইচওর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর বেশির ভাগই এখন অসংক্রামক রোগ। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে মারা যাচ্ছেন ৮০, ইস্কেমিক হৃদ্রোগে ৫৯, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা সিওপিডিতে ৩১ এবং ডায়াবেটিসে ১৯ জন। সংক্রামক রোগের মধ্যে যক্ষ্মায় প্রতি লাখে ২৬, ডায়রিয়ায় ১৮ এবং নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ১৬ জনের মৃত্যু হচ্ছে। মৃত্যুহার বেশি অসংক্রামক রোগে। তবে সংক্রামক রোগ এখনো উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
দেশে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি রোগ, ক্যানসার, সিওপিডি, অ্যাজমা, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, মানসিক রোগ, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, থাইরয়েড রোগ, গ্যাস্ট্রিক ও আলসার এবং ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার।
দেশে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেলথ বুলেটিন। ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩ ’-এ বলা হয়েছে, দেশে এখন অসুখ-বিসুখে মোট মৃত্যুর ৭০ দশমিক ২৬ শতাংশই ঘটছে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে হৃদ্রোগে ৩৪ শতাংশ, ক্যানসারে ১০ শতাংশ, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৭ শতাংশ, ডায়াবেটিসে ৪ শতাংশ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগে ১১ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে সংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার ২৩ শতাংশ।
অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, অসংক্রামক রোগের দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে দ্রুত নগরায়ণ, উপার্জন বৃদ্ধিসহ নানা কারণে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, তামাক ব্যবহার এবং মানুষের আয়ু বৃদ্ধি। জীবনযাত্রাজনিত এ পরিবর্তনগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকি সৃষ্টি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মন্তব্য ও সরকারের বক্তব্য
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আমরা সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেও অসংক্রামক রোগ বড় হুমকি হয়ে উঠছে। আবার সংক্রামক রোগও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব অসংক্রামক রোগের সঙ্গে সংক্রামক রোগের দ্বৈত বোঝার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এই মাত্রায় হামের প্রাদুর্ভাব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেকট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অসংক্রামক রোগ দ্রুত বেড়েছে, সংক্রামক রোগও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সমস্যা মূলত পরিকল্পনা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি, অর্থায়নের অভাব। বড় হাসপাতাল তৈরি করে বা যন্ত্রপাতি কিনে সমাধান হয় না। জনসচেতনতা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ছাড়া রোগের বোঝা কমানো কঠিন। গ্রাম ও শহরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করে রোগপ্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে ভবিষ্যতে ডাবল বার্ডেন কমবে।’
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সংক্রামক রোগপ্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা কোনো ডিজিজ বার্ডেন চাই না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত সারা দেশে ১১৮টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে হামে মারা গেছে ২০টি শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৮২টি শিশুর। একই সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ জনের।
৮ ঘণ্টা আগে
হাম রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারকে টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) আয়োজনে হাম রোগবিষয়ক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।
৮ ঘণ্টা আগে
হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় গতকাল রোববার থেকে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে যে ৩০টি উপজেলায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেখানে শিশুদের টিকা দিতে আসা অভিভাবকদের বেশ ভিড় দেখা গেছে।
১ দিন আগে
সারা দেশের সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে আগামী ৩ মে থেকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আজ (রোববার) ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা জানান।
২ দিন আগে