Ajker Patrika

নারীদের মানসিক সুস্থতায় জরুরি করণীয়

ডা. ফরিদা ইয়াসমিন সুমি 
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ১১: ১৫
নারীদের মানসিক সুস্থতায় জরুরি করণীয়

বর্তমান ব্যস্ত জীবন, পারিবারিক দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন সংকটের কারণে নারীদের মধ্যে উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি দিন দিন বাড়ছে। অনেক সময় এটি সাময়িক দুশ্চিন্তা হিসেবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই অ্যাংজাইটি সচেতনতা মাস নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

অ্যাংজাইটি হলো অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ভয়, অস্থিরতা বা মানসিক চাপের অনুভূতি; যা দৈনন্দিন কাজ, ঘুম, সম্পর্ক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সামান্য উদ্বেগ স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

নারীদের মধ্যে অ্যাংজাইটির সাধারণ কারণ

  • পরিবার ও সন্তান লালন-পালনের চাপ
  • কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যহীনতা
  • হরমোনজনিত পরিবর্তন (কৈশোর, গর্ভাবস্থা, মেনোপজ)
  • সম্পর্কগত সমস্যা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা
  • সামাজিক তুলনা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার
  • দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা

অ্যাংজাইটির সাধারণ লক্ষণ

  • অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ভয়
  • অস্থিরতা ও বিরক্তি
  • বুক ধড়ফড় করা ও শ্বাসকষ্টের অনুভূতি
  • ঘুমের সমস্যা
  • মনোযোগ কমে যাওয়া
  • ক্লান্তি ও দুর্বলতা
  • নেতিবাচক চিন্তা

অ্যাংজাইটি কমাতে কী করতে পারেন

  • নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন
  • নিজের মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা ভাববেন না। মন খারাপ, ভয় বা উদ্বেগ থাকলে তা স্বীকার করা মানসিক সুস্থতার প্রথম ধাপ।
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
  • প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। ঘুম কম হলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যেতে পারে।

নিয়মিত শরীরচর্চা করুন

হাঁটা, যোগব্যায়াম, হালকা ব্যায়াম বা মেডিটেশন শরীরে ‘ফিল-গুড’ হরমোন বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন

অতিরিক্ত ক্যাফেইন, জাঙ্ক ফুড ও অনিয়মিত খাবার অ্যাংজাইটি বাড়াতে পারে। ফল, শাকসবজি, পানি ও পুষ্টিকর খাবার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

নিজের জন্য সময় রাখুন

প্রতিদিন কিছু সময় নিজের পছন্দের কাজ করুন। বই পড়া, বাগান করা, নামাজ/প্রার্থনা, গান শোনা অথবা সৃজনশীল যেকোনো কাজ মন শান্ত রাখে।

অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমান

অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত ব্যবহার ভালো।

প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলুন

নিজের অনুভূতি পরিবার, বন্ধু বা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে ভাগ করলে মানসিক চাপ অনেক কমে যায়।

শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম ও মেডিটেশন

ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া, মাইন্ডফুলনেস ও মেডিটেশন উদ্বেগ কমাতে কার্যকর।

‘পারফেক্ট’ হওয়ার চাপ কমান

সব দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করতে হবে, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের অংশ।

প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন

যদি উদ্বেগ দীর্ঘদিন থাকে, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে

বা আতঙ্কজনিত সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা

নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পরিবার এবং সমাজের সহানুভূতিশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘এটা কিছু না’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্যও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাংজাইটি লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়; বরং সচেতনতা, নিজের যত্ন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মানসিকভাবে সুস্থ একজন নারী পরিবার ও সমাজকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারেন।

তাই নিজের যত্ন নিন, নিজের মনের কথা শুনুন।

ডা. ফরিদা ইয়াসমিন সুমি

প্রসূতি, স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক, রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত