Ajker Patrika

হামের টিকা অকার্যকর হওয়ার মতো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ নেই: আইসিডিডিআরবি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৪৭
হামের টিকা অকার্যকর হওয়ার মতো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ নেই: আইসিডিডিআরবি

বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসের এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত হাম-রুবেলা টিকার সুরক্ষা অকার্যকর করে দিতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে টিকার কার্যকারিতা হারিয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের পরীক্ষায় হাম শনাক্তের হার তুলনামূলক কম ছিল।

আজ রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এসব তথ্য জানিয়েছে।

গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বড় প্রাদুর্ভাবের পর ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে কি না, যা প্রচলিত টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে—এমন প্রশ্ন উঠেছিল। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য সেই আশঙ্কাকে সমর্থন করে না। বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বি৩ জিনোটাইপের, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শনাক্ত হয়েছে বলে জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে।

হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় যা পাওয়া গেছে

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আইসিডিডিআরবি যৌথভাবে একটি অনুসন্ধান করে। তাতে গত ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ৩২৪ জনের হাম নিশ্চিত হয়।

তাতে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা। এই বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের শরীরে হাম ভাইরাস শনাক্ত হয়। গবেষকদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রথম ডোজ নেওয়ার আগের সময়টি শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

টিকা অনুযায়ী সংক্রমণের চিত্র

বয়স ও টিকাদানের অবস্থা অনুযায়ী শিশুদের চারটি দলে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়। নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি—এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২টির (৯৭ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়। টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২টির (৯৭ শতাংশ) সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪টি (৯২ শতাংশ) ও দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬টির (৭৬ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়।

গবেষকেরা বলেছেন, এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে, দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ, গবেষণায় অংশ নেওয়া সবাই আগে থেকেই হাম উপসর্গের রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ফলে এই হারকে জনসংখ্যা পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতার সূচক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। টিকা না পাওয়া শিশুদের তুলনায় দুই ডোজ টিকাপ্রাপ্ত উপসর্গযুক্ত রোগীদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার কম পাওয়া গেছে, যা টিকার সুরক্ষা দেওয়ার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতা নির্ধারণে আরও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আইসিডিডিআরবির ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী নূরজাহান মালিহা বলেন, ‘সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের কারণে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই হাসপাতালভিত্তিক গবেষণার ফল দিয়ে জনসংখ্যা পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।’

গবেষকেরা জানান, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ব্যক্তিভেদে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার পার্থক্য, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়। বর্তমান অনুসন্ধান এসব কারণ নির্ধারণের জন্য পরিকল্পিত ছিল না।

জিনোম বিশ্লেষণে যা মিলেছে

ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি আইসিডিডিআরবি এবং ৩৭টি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সিকোয়েন্স করেছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব নমুনাই বি৩ উপশাখার এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসের সঙ্গে মিল রয়েছে। গবেষণায় ভাইরাসের এইচ প্রোটিনে চারটি মিউটেশন শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের ভাষ্য, এ ধরনের পরিবর্তন আগেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাওয়া গেছে। তাই এসব মিউটেশন থাকলেই প্রচলিত হাম-রুবেলা টিকা অকার্যকর হয়ে গেছে—এমনটি বলা যায় না। হাম ভাইরাস এখনো একক সেরোটাইপ হিসেবে রয়েছে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ভাইরাসটির একাধিক অংশ শনাক্ত করতে পারে। এসব পরিবর্তন টিকার সুরক্ষায় কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, তা জানতে আরও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।

মাতৃ অ্যান্টিবডি ও টিকাদান নিয়ে পর্যবেক্ষণ

গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাস ও দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। প্রথম ডোজের আগে শিশুরা মূলত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি ও সমাজে বিদ্যমান সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধের ওপর নির্ভরশীল থাকে।

আইসিডিডিআরবির আগের একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডির মাত্রা দ্রুত কমে যায়। তবে ওই গবেষণায় মাত্র ১৬ শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বড় গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

আরও গবেষণার প্রয়োজন

আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার তুলনামূলক বেশি হলেও এত বড় প্রাদুর্ভাব কেন ঘটল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ড. কামরুন নাহার বলেন, কোন কোন শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ছে এবং কোথাও রোগ প্রতিরোধের বড় ঘাটতি রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা জরুরি। এসব তথ্য ভবিষ্যতে টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে সহায়ক হবে।

আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিলেও আরও অনেক বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, টিকাপ্রাপ্ত কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হচ্ছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে কী কী কারণ কাজ করছে, অপুষ্টির ভূমিকা এবং মাতৃ অ্যান্টিবডির স্থায়িত্ব নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা চলবে।

নতুন গবেষণা ও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান

বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আইসিডিডিআরবি চারটি বিভাগীয় হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল কোহর্ট গবেষণা শুরু করেছে। পাশাপাশি জিনোমিক নজরদারি, শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, জিঙ্কের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং টিকাদান কর্মসূচি থেকে শিশুদের বাদ পড়ার কারণ নিয়েও পৃথক গবেষণা চলছে।

গবেষকেরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিশুর বয়স অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকার সব ডোজ সময়মতো নিশ্চিত করতে হবে এবং চলমান প্রাদুর্ভাবের সময় সরকারের টিকাদান-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত