Ajker Patrika

২০৩০ সালের বৈশ্বিক পুষ্টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিটি কর্মস্থলে চাই মাতৃদুগ্ধ কর্নার

কাজী মো. ওবায়দুল হক
২০৩০ সালের বৈশ্বিক পুষ্টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিটি কর্মস্থলে চাই মাতৃদুগ্ধ কর্নার
ছবি: সংগৃহীত

শিশুর জীবনের প্রথম ছয় মাস তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য, বৃদ্ধি ও মেধাবিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। এ সময় শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সহজলভ্য ও পূর্ণাঙ্গ খাবার হলো মায়ের দুধ। এটি শুধু ক্ষুধা মেটায় না; শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়, মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে এবং ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সুরক্ষা গড়ে তোলে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ১ থেকে ৭ আগস্ট পালিত হচ্ছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্যের বাংলা রূপ—‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের এবারের আহ্বান হলো, যেসব নীতি ও উদ্যোগ মাতৃদুগ্ধ পানের হার বাড়াতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলোকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা।

এ বছরের মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যরাষ্ট্রগুলো মাতৃ ও শিশুপুষ্টিবিষয়ক বৈশ্বিক লক্ষ্য সংশোধন করেছে। নতুন লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের শুধু মাতৃদুগ্ধ পানের হার অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আগের লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে হারটি ৫০ শতাংশে নেওয়া। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৮ শতাংশ শিশু প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পেয়েছে। এই অগ্রগতির ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৭৮তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে লক্ষ্যটি বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা এবং সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ লক্ষ্য থেকে কত দূরে

বাংলাদেশের জন্য ৬০ শতাংশের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা MICS 2025 অনুযায়ী, দেশে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের শুধু মাতৃদুগ্ধ পানের হার ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন বৈশ্বিক লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। তবে ২০১৯ সালের MICS-এ এই হার ছিল ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু ৬০ শতাংশে পৌঁছানো নয়; অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা এবং হারকে ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুর জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়া। MICS 2025 অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ নবজাতক জন্মের প্রথম ঘণ্টায় মায়ের দুধ পায়। ২০১৯ সালে হারটি ছিল ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ। জন্মের পরের এই প্রথম ঘণ্টা শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় মায়ের বুকে শিশুকে রাখা, ত্বকের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শ তৈরি করা এবং শালদুধ খাওয়ানো পরবর্তী মাতৃদুগ্ধ পানের সফলতা বাড়াতে সহায়তা করে।

শুধু মাতৃদুগ্ধ পান বলতে কী বোঝায়

‘শুধু মাতৃদুগ্ধ পান’ বা এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং বলতে বোঝায়, শিশুকে জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ দেওয়া। এ সময় পানি, মধু, চিনির পানি, গরুর দুধ, কৌটার দুধ, ফলের রস, চা, ভেষজ তরল বা অন্য কোনো খাবার দেওয়া যাবে না।

শিশু সরাসরি মায়ের বুক থেকে দুধ পান করতে পারে। পাশাপাশি চেপে বা পাম্পের সাহায্যে বের করা মায়ের দুধ, ধাই বা অন্য নারীর দুধ এবং দাতার দান করা নিরাপদ মানবদুধও মাতৃদুগ্ধ হিসেবে গণ্য হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে দেওয়া ওষুধ, খাবার স্যালাইন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিংয়ের সংজ্ঞাকে পরিবর্তন করে না। তবে প্রচলিত টোটকা, ভেষজ পানি বা চা দেওয়া হলে শিশুকে আর শুধু মাতৃদুগ্ধ পানকারী হিসেবে ধরা হবে না।

এই হার সাধারণত জরিপের আগের ২৪ ঘণ্টায় শূন্য থেকে পাঁচ মাস বয়সী কত শতাংশ শিশু শুধু মায়ের দুধ পেয়েছে, তার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। এটি জনসংখ্যাভিত্তিক অগ্রগতি পরিমাপের স্বীকৃত পদ্ধতি হলেও কোনো নির্দিষ্ট শিশুকে জন্মের পর থেকে প্রতিদিন শুধু বুকের দুধ দেওয়া হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে প্রমাণ করে না।

মাতৃদুগ্ধ শিশুর জীবনের সুরক্ষা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুমৃত্যু কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম ছয় মাস শুধু মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত করার সম্ভাব্য প্রভাব সবচেয়ে বেশি। মায়ের দুধে শিশুর প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টির পাশাপাশি এমন অ্যান্টিবডি থাকে, যা তাকে বিভিন্ন সাধারণ সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পেতে সহায়তা করে। বুকের দুধ পাওয়া শিশুদের পরবর্তী জীবনে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম। মাতৃদুগ্ধ পান মায়ের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক।

বিশ্বব্যাপী মাতৃদুগ্ধ পানের হার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে নেওয়া গেলে বছরে আট লাখের বেশি শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ পাওয়া শিশুদের তুলনায় একেবারেই বুকের দুধ না পাওয়া শিশুদের প্রথম জন্মদিনের আগেই মারা যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১৪ গুণ বেশি হতে পারে।

এই তথ্যগুলো ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং বোঝানোর জন্য যে মাতৃদুগ্ধ পান কেবল একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি শিশুর বেঁচে থাকা, পুষ্টি, জনস্বাস্থ্য এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় বিষয়।

কর্মজীবী মায়ের সবচেয়ে বড় বাধা কর্মক্ষেত্র

বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশের লক্ষ্য অতিক্রম করতে হলে কর্মজীবী মায়েদের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে হবে। সন্তান জন্মের পর একজন মা হয়তো বুকের দুধ খাওয়াতে আগ্রহী। কিন্তু কাজে ফেরার পর অফিসে দুধ খাওয়ানো বা দুধ বের করার জন্য নিরাপদ জায়গা না থাকলে সেই আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

অনেক কর্মস্থলে মায়েরা বিশ্রামকক্ষ, সিঁড়িঘর, স্টোররুম কিংবা শৌচাগার ব্যবহারে বাধ্য হন। কোথাও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নেই, কোথাও দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই, আবার কোথাও কাজের চাপের কারণে প্রয়োজনীয় বিরতি পাওয়া যায় না। ফলে দুধ জমে ব্যথা, প্রদাহ বা সংক্রমণ হতে পারে এবং ধীরে ধীরে মায়ের দুধ উৎপাদনও কমে যেতে পারে।

এ কারণেই সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং মল, কলকারখানা ও গণপরিবহন টার্মিনালসহ প্রতিটি বড় কর্মস্থলে মাতৃদুগ্ধ বা ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা প্রয়োজন।

একটি মাতৃদুগ্ধ কর্নার শুধু পর্দা দেওয়া একটি কক্ষের নাম নয়। সেটি হতে হবে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, আরামদায়ক ও ব্যক্তিগত স্থান। শৌচাগারের ভেতরে বা পাশে নয়, কর্মস্থলের কাছাকাছি একটি পৃথক কক্ষে এর ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে আরামদায়ক চেয়ার, ছোট টেবিল, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং দুধ সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট রেফ্রিজারেটর বা কোল্ড স্টোরেজ থাকা প্রয়োজন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা গেলেও জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকতে হবে এবং কক্ষের ভেতরে কোনো সিসিটিভি রাখা যাবে না।

কর্নারের পাশাপাশি মায়েদের বেতনসহ প্রয়োজনীয় বিরতি, নমনীয় কর্মঘণ্টা এবং কর্মস্থলের কাছে সাশ্রয়ী দিবাযত্ন কেন্দ্র দিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ জানিয়েছে, মাতৃদুগ্ধ-বান্ধব কর্মনীতি কর্মীর অনুপস্থিতি কমায়, দক্ষ নারী কর্মীদের প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং নতুন কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যয় কমায়। অর্থাৎ ব্রেস্টফিডিং কর্নার প্রতিষ্ঠা কোনো দয়া বা অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি মা ও শিশুর অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানের জন্যও লাভজনক বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের জন্য সাতটি নীতিগত অগ্রাধিকার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের নেতৃত্বাধীন গ্লোবাল ব্রেস্টফিডিং কালেকটিভ মাতৃদুগ্ধ সুরক্ষা, প্রচার ও সহায়তার জন্য সাতটি নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশে এগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করতে হবে।

পর্যাপ্ত ও নির্দিষ্ট অর্থায়ন

মাতৃদুগ্ধ কার্যক্রমের জন্য জাতীয় বাজেটে আলাদা বরাদ্দ প্রয়োজন। শুধু পোস্টার, সেমিনার বা মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে ব্যয় করলে হবে না। হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি কাউন্সেলিং, ডিজিটাল প্রচার, কর্মস্থলের কর্নার এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে নিয়মিত অর্থায়ন দরকার।

সরকার চাইলে মাতৃদুগ্ধ কর্নার স্থাপনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা, কারিগরি সহায়তা বা স্বল্প ব্যয়ের সরঞ্জাম দিতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্নার স্থাপনের জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক বাজেটে নির্দিষ্ট অর্থ রাখা যেতে পারে।

বিকল্প দুধের বিপণন নিয়ন্ত্রণ

মায়ের দুধের বিকল্প পণ্য, বোতল ও নিপলের অনৈতিক বিপণন মায়েদের আত্মবিশ্বাস দুর্বল করতে পারে। হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে বিনা মূল্যে নমুনা বিতরণ, উপহার দেওয়া, বিভ্রান্তিকর স্বাস্থ্যদাবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন বিজ্ঞাপন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রচলিত আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি হাসপাতাল, ফার্মেসি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও স্বার্থের সংঘাত থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

বেতনসহ ছুটি ও কর্মক্ষেত্রে সহায়তা

মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃদুগ্ধ সহায়তা শেষ হয়ে যেতে পারে না। চাকরিতে ফেরার পর মাকে বেতনসহ দুধ খাওয়ানো বা দুধ বের করার বিরতি, নমনীয় সময়সূচি, মাতৃদুগ্ধ কর্নার এবং দিবাযত্ন সুবিধা দিতে হবে।

এই সুবিধা শুধু স্থায়ী সরকারি কর্মচারী বা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পোশাকশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, গৃহকর্মী, দোকানকর্মী, পরিবহনশ্রমিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারীদের জন্য বাজার, শিল্পাঞ্চল, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও কমিউনিটি ক্লিনিককেন্দ্রিক মাতৃদুগ্ধ কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।

হাসপাতালে ‘সফল মাতৃদুগ্ধ পানের ১০টি ধাপ’

প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রসূতি হাসপাতালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সফল মাতৃদুগ্ধ পানের ১০টি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। জন্মের পর মা ও শিশুকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আলাদা না করা, দ্রুত ত্বকের সংস্পর্শ তৈরি, প্রথম ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ শুরু এবং চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া বিকল্প দুধ না দেওয়ার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশু, অপরিণত নবজাতক এবং অসুস্থ শিশুর জন্য মায়ের নিজের দুধ বা নিরাপদ দান করা মানবদুধের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

দক্ষ কাউন্সেলিং

অনেক মা দুধ কম হওয়া, স্তনে ব্যথা, শিশুর সঠিকভাবে মুখ লাগাতে না পারা বা পরিবারের ভুল পরামর্শের কারণে বুকের দুধ দেওয়া বন্ধ করেন। এসব সমস্যার বড় অংশ দক্ষ পরামর্শ ও হাতে-কলমে সহায়তার মাধ্যমে সমাধান করা যায়।

কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মাতৃসদন ও হাসপাতালে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর রাখতে হবে। প্রসবপূর্ব ও প্রসবপরবর্তী সেবার অংশ হিসেবে মা, বাবা ও পরিবারের সদস্যদের কাউন্সেলিং দিতে হবে। বড় অফিস ও কারখানাগুলো মাসে অন্তত একবার স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধ কাউন্সেলিং সেশন আয়োজন করতে পারে।

পরিবার ও সামাজিক নেটওয়ার্ক

মাতৃদুগ্ধ পান শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়। বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, সহকর্মী, ব্যবস্থাপক এবং সমাজের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরা ঘরের কাজ ভাগ করে নিলে, মাকে বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার দিলে এবং ভুল প্রচলিত ধারণা থেকে দূরে রাখলে মাতৃদুগ্ধ পান অব্যাহত রাখা সহজ হয়।

কর্মস্থলে মানবসম্পদ বিভাগ, ব্যবস্থাপক এবং সহকর্মীদেরও সংবেদনশীল হতে হবে। দুধ বের করার বিরতিকে অলসতা বা কাজ ফাঁকি হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বদলাতে হবে।

নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি

দেশে কতটি অফিসে কার্যকর মাতৃদুগ্ধ কর্নার রয়েছে, কতজন মা তা ব্যবহার করছেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় বিরতি দিচ্ছে কি না—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। শুধু কর্নারের নামফলক লাগানো হয়েছে কি না, তা নয়; সেটি পরিচ্ছন্ন, ব্যবহারযোগ্য ও সব কর্মদিবসে খোলা আছে কি না, তাও পরিদর্শন করতে হবে।

সরকার একটি জাতীয় ড্যাশবোর্ড চালু করতে পারে, যেখানে জেলা ও খাতভিত্তিক এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিংয়ের হার, জন্মের প্রথম ঘণ্টায় মাতৃদুগ্ধ পান, হাসপাতালের মান, কর্মস্থলের কর্নার এবং বরাদ্দের তথ্য প্রকাশ করা হবে। এতে ভালো প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি পাবে এবং পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

দুর্যোগেও মাতৃদুগ্ধ সুরক্ষা

বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড বা বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতিতে মাতৃদুগ্ধ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তখন নিরাপদ পানি, খাবার ও জ্বালানির সংকট দেখা দেয়। আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের জন্য ব্যক্তিগত মাতৃদুগ্ধ স্থান, খাবার, নিরাপদ পানি ও কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন যাচাই ছাড়া কৌটার দুধের অনিয়ন্ত্রিত অনুদান নিরুৎসাহিত করাও জরুরি। গ্লোবাল ব্রেস্টফিডিং কালেকটিভের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, অধিকাংশ দেশে জরুরি পরিস্থিতিতে মাতৃদুগ্ধ সুরক্ষার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা এখনো নেই।

কর্নার বাড়ানোই হতে পারে বাংলাদেশের বড় পদক্ষেপ

বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং হার নিয়ে ২০৩০ সালের ৬০ শতাংশ লক্ষ্যের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এই ব্যবধান শুধু প্রচারপত্র দিয়ে পূরণ করা যাবে না। মায়ের বাস্তব জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে।

প্রতিটি সরকারি দপ্তর, বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, কারখানা, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর মাতৃদুগ্ধ কর্নার স্থাপন করা গেলে হাজার হাজার কর্মজীবী মা সন্তানকে প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ দেওয়া চালিয়ে যেতে পারবেন। এর সঙ্গে প্রয়োজন বেতনসহ বিরতি, নমনীয় কর্মব্যবস্থা, দিবাযত্ন কেন্দ্র, দক্ষ কাউন্সেলিং এবং সম্মানজনক সামাজিক পরিবেশ।

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বুকের দুধ খাওয়ানো একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এটি সফল করতে সহায়ক ব্যবস্থা প্রয়োজন। একজন মা যখন কর্মস্থলে দুধ বের করার জন্য নিরাপদ কক্ষ পান, তখন শুধু একটি শিশুর খাবার নিশ্চিত হয় না; শিশুর স্বাস্থ্য, মায়ের কর্মজীবন এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ—তিনটিই সুরক্ষিত হয়।

২০৩০ সালের ৬০ শতাংশ লক্ষ্য তাই শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য নয়। এটি শ্রম, জনপ্রশাসন, শিক্ষা, শিল্প, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি খাত এবং প্রতিটি নিয়োগকর্তার যৌথ দায়িত্ব। বাংলাদেশের প্রতিটি কর্মস্থলে একটি কার্যকর মাতৃদুগ্ধ কর্নার প্রতিষ্ঠাই হতে পারে সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে দৃশ্যমান, বাস্তবসম্মত ও টেকসই পদক্ষেপ।

তথ্য ও নীতিগত সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্লোবাল ব্রেস্টফিডিং কালেকটিভ এবং বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫।

কাজী মো. ওবায়দুল হক স্কেলিং আপ নিউট্রিশন (সান) মুভমেন্ট বাংলাদেশের কো-অর্ডিনেটর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নিযুক্ত। তিনি বাংলাদেশে বহুখাতভিত্তিক পুষ্টি, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং মাতৃদুগ্ধবান্ধব নীতি ও পরিবেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কাজ করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত