Ajker Patrika

প্রায় সব ব্র্যান্ডের বিড়ালের খাবারেই বিষ, আছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানও: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
প্রায় সব ব্র্যান্ডের বিড়ালের খাবারেই বিষ, আছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানও: গবেষণা
বিড়ালের খাবারে বিষাক্ত ভারী ধাতু ও আগাছানাশকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত

বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ধরনের বিড়ালের খাবারে সিসা, পারদ, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর ভারী ধাতু, আগাছানাশক এবং প্লাস্টিক প্রস্তুতকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক পাওয়া গেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা পণ্য পরীক্ষাকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ক্লিন লেবেল প্রজেক্ট’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিড়ালের খাবারের ১০০টি শীর্ষস্থানীয় জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ১২২ টিরও বেশি নমুনার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। শুকনো (ড্রাই ফুড), ভেজা (ওয়েট ফুড) কিংবা ফ্রিজ-ড্রাইড—সব ধরনের ক্যাট ফুডেই এই ক্ষতিকর উপাদান মিলেছে। এমনকি যেসব পণ্যকে ‘প্রাকৃতিক’ বা ‘উচ্চ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন’ হিসেবে বাজারজাত করা হয়, সেগুলোও এই বিষ থেকে মুক্ত নয়।

প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক এবং ‘ক্লিন লেবেল প্রজেক্ট’-এর নির্বাহী পরিচালক মলি হ্যামিল্টন বলেন, ‘বেশির ভাগ বিড়াল প্রতিদিন প্রায় একই খাবার খেয়ে থাকে। ফলে এসব ক্ষতিকর উপাদান তাদের শরীরে ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বয়স্ক বিড়ালদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ। আর শরীর থেকে ভারী ধাতু ছেঁকে বের করার ক্ষেত্রে কিডনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’

৬২টি ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের ১০০টি পণ্যের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে আসে: ৯৯ শতাংশ নমুনায় বিষাক্ত সিসা পাওয়া গেছে; ৯৬ শতাংশ নমুনায় মিলেছে ক্যাডমিয়াম; ৯৪ শতাংশ খাবারে পাওয়া গেছে আর্সেনিক।

গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক বা ড্রাই ক্যাট ফুডে সিসার পরিমাণ ভেজা খাবারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। মানুষের জন্য সিসার কোনো মাত্রাই নিরাপদ নয়; বিশেষ করে ছোট শরীর দ্রুত এই বিষ শোষণ করে নেয়। বিড়াল বা অন্যান্য ছোট পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য।

ক্যাডমিয়াম মানুষের শরীরে ক্যানসার সৃষ্টি করে এবং কিডনি ও হাড়ের ক্ষতি করে। অন্যদিকে সিসা শরীরের প্রায় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে পারে।

মাছ বনাম মুরগি: কোন খাবারে কী ধরনের ঝুঁকি?

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোটিনের উৎসের ওপর নির্ভর করে বিষাক্ততার ধরন ভিন্ন হয়। মাছ বা সামুদ্রিক খাবার দিয়ে তৈরি ক্যাট ফুডে পারদ ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। অন্যান্য প্রোটিনযুক্ত খাবারের তুলনায় সামুদ্রিক মাছের খাবারে পারদের মাত্রা প্রায় ১৮ গুণ এবং ক্যাডমিয়ামের মাত্রা ২ দশমিক ৫ গুণ। সামুদ্রিক মাছের ভেজা খাবারে পারদের পরিমাণ সাধারণ মুরগির মাংসের ভেজা খাবারের চেয়ে প্রায় ২৮ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

অপরদিকে প্রোটিন হিসেবে মুরগির মাংসের ব্যবহারে পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা তুলনামূলক কম পাওয়া গেলেও, এতে সিসা এবং আগাছানাশক রাসায়নিকের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।

হ্যামিল্টন বলেন, ‘মুরগির মাংসে পারদ কম থাকলেও সিসা ও আগাছানাশক বেশি। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি—কারণ আপনি কোন বিষাক্ত উপাদানটি এড়াতে চান সেটি বেছে নিতে পারছেন না।’

ক্লিন লেবেল প্রজেক্টের পরিচ্ছন্নতার মানদণ্ডে মুরগিভিত্তিক খাবারের প্রায় ৮৫ শতাংশ উত্তীর্ণ হতে পেরেছে, যেখানে সামুদ্রিক মাছভিত্তিক খাবারের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিড়ালের খাবারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন যোগ করার জন্য প্রস্তুতকারকেরা শাকসবজি বা উদ্ভিজ্জ উপাদান ব্যবহার করেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, অরগানিক বা জৈব পদ্ধতিতে চাষ না করা এসব উপাদানের মাধ্যমে খাবারে ক্ষতিকর উপাদান ঢুকে পড়ছে।

কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশক গ্লাইফোসেট (Glyphosate) পাওয়া গেছে ৩৭ শতাংশ ক্যাট ফুডে। প্রথম ১০টি উপাদানের মধ্যে উদ্ভিজ্জ উপাদান যত বেশি, সেই খাবারে গ্লাইফোসেটের মাত্রাও তত বেশি পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ক্যানসার বিষয়ক গবেষণা সংস্থা গ্লাইফোসেটকে ‘মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে এমন সম্ভাব্য উপাদান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এ ছাড়া, অর্ধেকেরও বেশি ক্যাট ফুডে ডিইএইচপি নামক এক ধরনের প্লাস্টিক কেমিক্যালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা ক্যানসার এবং জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায়। কৌটা ও পাউচজাত ক্যাট ফুডে এর মাত্রা সর্বাধিক।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা নিরাপত্তা সংস্থা ‘টক্সিক ফ্রি ফিউচার’-এর বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক রায়েন বাবাদি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে এটি একটি সুপরিচালিত গবেষণা। পোষা প্রাণীর খাবার ও প্যাকেজিং থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক দূর করতে খুচরা বিক্রেতাদের বাধ্য করা উচিত।’

অন্যদিকে, ক্যাট ফুড প্রস্তুতকারকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘পেট ফুড ইনস্টিটিউট’-এর সিইও এলিস ফেনিগ এক ই-মেইল বার্তায় সিএনএন-কে জানান, ক্যাট ফুড প্রস্তুতকারকেরা কঠোর খাদ্য নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করেন।

তিনি বলেন, ‘বিড়ালের মালিকেরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে তাঁদের পোষা প্রাণীর খাবার নিরাপদ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক মান বজায় রেখেই উৎপাদিত হচ্ছে।’

তবে ক্লিন লেবেল প্রজেক্ট নিশ্চিত করেছে, পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিটি পণ্য বাজার থেকে সরাসরি কেনা হয়েছিল এবং কোনো ব্র্যান্ডই পরীক্ষা বা বিশ্লেষণে প্রভাব ফেলার সুযোগ পায়নি।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বিড়ালের খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে মালিকদের বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হলো:

১. খাবারে বৈচিত্র্য আনুন: বিড়াল যদি সামুদ্রিক মাছ পছন্দ করে, তবে কেবল মাছ না দিয়ে মাঝে মাঝে মুরগি বা অন্য প্রোটিন দিন। এতে প্রতিদিন পারদ বা ক্যাডমিয়াম গ্রহণের মাত্রা কমে আসবে।

২. লেবেল সতর্কতার সঙ্গে পড়ুন: নামের মধ্যে মাছ না থাকলেও অনেক ক্যাট ফুডে সামুদ্রিক মাছের উপাদান থাকে। তাই উপাদানের তালিকা সাবধানে পর্যালোচনা করুন।

৩. পণ্যের প্রথম উপাদানের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা করবেন না: অনেক সময় প্রথম উপাদান দেখে বোঝা যায় না যে ভেতরে মাছের কোন অংশ (যেমন: কলিজা, অন্ত্র বা মাথা) ব্যবহার করা হয়েছে, যা ক্ষতিকর রাসায়নিক বেশি ধারণ করে।

৪. প্রস্তুতকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন: প্রিয় ব্র্যান্ডটি নিয়মিত নিরাপত্তা ও রাসায়নিক পরীক্ষা করে কিনা তা জানতে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত