Ajker Patrika

সরকারি মেডিকেল কলেজ: হাসপাতাল নেই ১২টিতে, ব্যবহারিক শিক্ষায় বাধা

  • ক্লিনিক্যাল শিক্ষা চলে জেলা বা জেনারেল হাসপাতালে
  • তৃতীয় বর্ষ থেকে হাসপাতালই প্রশিক্ষণের প্রধান ক্ষেত্র
  • নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে শঙ্কা
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
সরকারি মেডিকেল কলেজ: হাসপাতাল নেই ১২টিতে,
ব্যবহারিক শিক্ষায় বাধা
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ। ছবি: সংগৃহীত

একটি মেডিকেল কলেজের পূর্ণাঙ্গতার অন্যতম বড় শর্ত নিজস্ব হাসপাতাল থাকা। চিকিৎসা শিক্ষায় ‘ল্যাবরেটরি’ হিসেবে কাজ করে এই হাসপাতাল। পাঠ্যবইয়ের তথ্য ও তত্ত্বের বাইরে সত্যিকারের রোগীর সংস্পর্শ ও তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ছাড়া এ শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। কিন্তু দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদে:র সেই ব্যবহারিক শিক্ষার প্রধান ক্ষেত্র, অর্থাৎ নিজস্ব হাসপাতাল নেই।

ডাক্তার হতে যাওয়া একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীকে রোগীর ইতিহাস নেওয়া, শারীরিক পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ হাতে-কলমে শিখতে হয়।

সেটা যথাযথভাবে সম্ভব শুধু রোগী ভর্তি থাকা নিজস্ব হাসপাতালেই। কিন্তু স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ১২টির শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষার জন্য জেলা সদর বা জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কোনো কোনো কলেজ থেকে এসব হাসপাতালের দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার। এছাড়া জেলা সদর বা জেনারেল হাসপাতালের মতো মাধ্যমিক পর্যায়ের চিকিৎসালয়ে যথেষ্টসংখ্যক জটিল রোগী, শয্যা, অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা, বিশেষায়িত বিভাগ, শিক্ষক ও অন্যান্য সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এতে ওই ১২টি কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নেই হাসপাতাল কিংবা একাডেমিক ভবন

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, পাবনা, নোয়াখালী ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালে। প্রতিটিতে ২৫০ থেকে ৫০০ শয্যার হাসপাতালের অনুমোদন রয়েছে। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত যশোর মেডিকেল কলেজ এবং ২০১৪ সালের জামালপুর মেডিকেল কলেজে যথাক্রমে ২৭৮ এবং ২৫০ শয্যার হাসপাতালের অনুমোদন রয়েছে। এই পাঁচটি কলেজের নিজস্ব একাডেমিক ভবন থাকলেও নিজস্ব হাসপাতাল নেই।

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে, হবিগঞ্জ ২০১৭ সালে এবং নীলফামারী, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা ও চাঁদপুর ২০১৮ সালে। এসব কলেজের স্বতন্ত্র একাডেমিক ভবন বা নিজস্ব হাসপাতাল কোনোটিই নেই। রাঙামাটি, হবিগঞ্জ, নীলফামারী, নওগাঁ, মাগুরা ও চাঁদপুরের জন্য ২৫০ শয্যার এবং নেত্রকোনার জন্য ২২২ শয্যার হাসপাতালের অনুমোদন রয়েছে।

১২ কলেজের কয়েকটিতে নিজস্ব হাসপাতাল নির্মাণকাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ কাজও শেষ হয়নি। যদিও শিক্ষার্থী ভর্তির কয়েক বছর পরই ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে, তা আগে থেকেই জানা ছিল।

বেগমগঞ্জে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ ১৭ বছর পরও নিজস্ব হাসপাতাল পায়নি। ক্লিনিক্যাল ও ব্যবহারিক শিক্ষা এবং ইন্টার্নশিপ হচ্ছে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার মাইজদীকোর্টে অবস্থিত ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে।

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নিজস্ব হাসপাতালের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালকে কলেজের অস্থায়ী হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের যাতায়াতে প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল বা জেলা হাসপাতালের মধ্যে রোগীর ধরন, জটিল রোগী ব্যবস্থাপনা ও ক্লিনিক্যাল কেসের বৈচিত্র্যে পার্থক্য রয়েছে।’

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে কলেজের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লিনিক্যাল শিক্ষা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। তবে নিজস্ব হাসপাতাল থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। নিজস্ব হাসপাতালের জন্য ৫০০ শয্যার পরিকল্পনা রয়েছে।’

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. প্রীতি প্রসূন বড়ুয়া বলেন, ‘কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা ও ইন্টার্নশিপ হচ্ছে ২৫০ শয্যার রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে। এ পর্যন্ত সাতটি ব্যাচ এমবিবিএস শেষ করেছে। কলেজের নিজস্ব ভবন ও হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরুর পর্যায়ে রয়েছে।’

হাসপাতালই মেডিকেল শিক্ষার ‘ল্যাবরেটরি’

ডাক্তারি পড়ার তৃতীয় বর্ষ থেকে হাসপাতাল হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের প্রধান ক্ষেত্র। রোগীর ইতিহাস নেওয়া, শারীরিক পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে ক্লিনিক্যাল দক্ষতা। পাঁচ বছরের এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্স শেষে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) থেকে চিকিৎসকের সাময়িক নিবন্ধন নিয়ে এক বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ করতে হয়। ইন্টার্নশিপ সফলভাবে শেষ করার পর চিকিৎসক হিসেবে স্থায়ী নিবন্ধন দেয় বিএমডিসি।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতাল শুধু মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক অংশ নয়; রোগী, বিভিন্ন বিভাগ, চিকিৎসক ও বৈচিত্র্যময় ক্লিনিক্যাল কেস—সবই শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষার অংশ।

চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন (ডব্লিউএফএমই) বিভিন্ন দেশের মেডিকেল শিক্ষা প্রদানকারী সংস্থার মান ও কার্যক্রম মূল্যায়ন করে স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির বৈশ্বিক মানদণ্ড ও নীতিমালায় পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল টিচিং সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে নিজস্ব হাসপাতালের সুবিধা না থাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা অন্যদের সমমানের দক্ষতা নিয়ে চিকিৎসাসেবায় আসতে পারছেন না বলে মনে করেন ডব্লিউএফএমই-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘চিকিৎসাশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সবার জন্য একই মানের হওয়া জরুরি। যেসব মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই, সেসব কলেজের শিক্ষার্থীদের জেলা বা জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ পূর্ণতা পায় না। এসব হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসাসেবা বেশি হওয়ায় জটিল রোগ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার অভিজ্ঞতা পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এই ঘাটতি চিকিৎসকদের দক্ষতায় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সামগ্রিক চিকিৎসাসেবায় তার প্রভাব পড়ে।’

বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল বলছে, মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, ক্লিনিক্যাল টিচিং, অবকাঠামো ও প্রকাশনাসহ ১১টি বিষয় মূল্যায়ন করা হয়। হাসপাতাল থাকা শুধু অবকাঠামোর বিষয় নয়; শিক্ষার্থীরা কী ধরনের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন, সেটিও চিকিৎসা শিক্ষার মানের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

স্বাস্থ্যসেবায় বঞ্চিত রোগীরা

মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল তৃতীয় পর্যায়ের বা বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান থেকে রোগী এখানে রেফার করা হয়। ফলে কোনো এলাকায় মেডিকেল কলেজ থাকলেও নিজস্ব হাসপাতাল না থাকলে স্থানীয় মানুষও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন।

হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষে। সাত-আট বছর পরও কলেজটির ক্লাস ও দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালের কয়েকটি কক্ষে। নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা চলছে সদর হাসপাতালকেন্দ্রিক। সেখানে পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত সেবা নেই। ফলে এমন হাসপাতালে শিক্ষার্থীরা জটিল রোগ ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন না।

পুরোনো সংকটের মধ্যেই নতুন কলেজ

বিদ্যমান সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর হাসপাতাল, শিক্ষক ও একাডেমিক অবকাঠামোর ঘাটতির মধ্যেই এ বছরই ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদীতে নতুন দুটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন প্রতিষ্ঠান চালুর আগে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের অবকাঠামো কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ক্ষেত্রে নিজস্ব হাসপাতাল নেই—এভাবে বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। এসব কলেজের সঙ্গে সংযুক্ত হাসপাতাল রয়েছে। তবে কোথাও কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা ও ইন্টার্নশিপ করতে হচ্ছে। মেডিকেল কলেজের সঙ্গে সংযুক্ত হাসপাতালে শিক্ষা নেওয়াই আদর্শ ব্যবস্থা। বর্তমানে কয়েকটি কলেজের নিজস্ব হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে; শেষ হতে দেড় থেকে দুই বছর লাগতে পারে।’

মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘পুরোনো কলেজগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার আলাদা প্রকল্প নিচ্ছে। নতুন কলেজের ক্ষেত্রেও শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নরসিংদী মেডিকেল কলেজের পাশে থাকা ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। ফলে সেখানে আলাদা হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। আর ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজের প্রকল্পের মধ্যেই হাসপাতালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত