ফ্যাক্টচেক /সাজেকে সংঘাত দাবিতে ছড়ানো ভিডিওগুলো মিয়ানমার ও আসামের

সস্প্রতি রাঙামাটির সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও ইউপিডিএফের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
গত ২২ অক্টোবর বিবিসির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার সাজেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরুর প্রথম দিনেই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
তবে এই সংঘাতের রেশ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজেক ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—এমন বেশ কিছু পুরোনো ও ভিনদেশি ভিডিও সাজেকের ঘটনা দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে। কোনো কোনো পোস্টে এসব ঘটনা দেশের গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে না বলেও দাবি করা হয়েছে। আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে এমন কয়েকটি দাবির সত্যতা যাচাই করা হয়েছে।
মিয়ানমারের সংঘাতের ভিডিওকে বাংলাদেশের বলে প্রচার
সম্প্রতি এক্সের একটি অ্যাকাউন্টে সশস্ত্র ব্যক্তিদের মধ্যে সংঘর্ষের একটি ভিডিওশেয়ার করে দাবি করা হয়, ভিডিওটি চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক সংঘর্ষের দৃশ্য।
ভিডিওটির বিভিন্ন কি-ফ্রেমের মাধ্যমে অনুসন্ধানে মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী–এর ইংরেজি সংস্করণে- এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শেয়ার করা সাত মিনিটের মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়।
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর শেয়ার করা ওই ভিডিওর ৩ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড দিকে সম্প্রতি দাবিতে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যের মিল রয়েছে। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে ইংরেজি ভাষায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে লড়াইয়ে আরাকান আর্মির সেনারা জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের মংডু শহরে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সেনাদের লড়াই করতে দেখা যায়। আরাকান আর্মির দাবি, শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইয়ের সময় তারা জান্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে আটক করেছে। এ ছাড়া জান্তা বাহিনীর পক্ষে লড়াই করা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির সদস্যদেরও আটক করা হয়েছে।’

এ ছাড়া ভিডিওটির সূত্র হিসেবে ‘এএ ইনফো ডেস্ক’-এর নাম উল্লেখ করা হয়। মংডু বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ক্যাপশনে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করা হলেও সংঘর্ষটি ঘটেছিল মিয়ানমারের ভূখণ্ডে। আরও অনুসন্ধানে গত বছর আইয়েয়ারওয়াদি টাইমস-এর শেয়ার করা ভিডিওতেও একই দৃশ্য পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, মিয়ানমারের মংডুতে আরাকান আর্মি ও দেশটির সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষের দৃশ্য বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের ভিডিওকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠীর মহড়া বলে প্রচার
‘বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে পড়েছে ইউপিডিএফ উগ্রবাদী গোষ্ঠী, অথচ আমাদের দেশের মিডিয়া টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচার করছে না? কিন্তু কেন দেশের মানুষকে জানতে দেওয়া হচ্ছে না দেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে!’—এমন ক্যাপশনে ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে গত ২০ আগস্ট ‘ARMY ESAN’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে থাই ভাষায় লেখা ছিল, ‘প্রশিক্ষণে আসার সময়েও তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বর্ম পরে আসে।’ তবে ভিডিও কিংবা ক্যাপশনে ইউপিডিএফের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ভিডিওটি সাম্প্রতিক দাবি করা হলেও কয়েক মাস আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে।

আসামের কনটেন্ট নির্মাতার ভিডিওকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা বলে প্রচার
পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফের একটি গোষ্ঠী সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না—এমন দাবিতে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। ভিডিওতে অস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে দেখা যায়।
প্রচারিত ওই ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আসসালামু আলাইকুম, পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি বাঁচাতে চান তাহলে অতি দ্রুত এদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক। কারণ এরা ইউপিডিএফ নামের একটা গোষ্ঠী। বাংলাদেশের কোনো সেনাবাহিনী, প্রশাসনকে পার্বত্য জেলার মধ্যে ঢুকতে দিচ্ছে না, একের পর এক ফায়ার করতেছে। অতএব ভিডিওটা শেয়ার করে বাংলাদেশ সরকারের কাছে পৌঁছে দেন।’
অনুসন্ধানে ‘Rongjali Narzary’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে একই ভিডিও পাওয়া যায়। অ্যাকাউন্টি পর্যবেক্ষণে জনা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতের আসামের কোকরাঝাড়ের বাসিন্দা। অ্যাকাউন্টিতে প্রায় একই ধরনের আরও (১, ২) ভিডিও পাওয়া যায়। এসব ভিডিওগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অস্ত্রগুলো আসল নয় এবং বেশিরভাগ ভিডিও সাজানো। এ ছাড়া ‘N.rongjali’ নামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও ভিডিওটি। অর্থাৎ, ভারতের আসামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভিডিওকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা বলে প্রচার করা হয়েছে।

মিয়ানমারে অভিযানের ভিডিওকে সাজেকের ঘটনা বলে প্রচার
সাজেকের পরিস্থিতি দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘War Noir’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টে গত ১৩ অক্টোবর একইভিডিও পাওয়া যায়। পোস্টের কাপশনে বলা হয়, এটি কেএনএলএ বা কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি অবস্থানে হামলা চালানোর দৃশ্য।

পরে আরও অনুসন্ধানে ‘People’s Spring’নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলেও একই ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওর শিরোনাম ও বিস্তারিত বিবরণে বলা হয়, ১২ অক্টোবর সকালে কেএনএলএ ও তাদের মিত্র বাহিনী মিয়ানমারের তানিনথারী অঞ্চলের পালাও টাউনশিপে দেশটির সেনাবাহিনীর একটি ফাঁড়িতে হামলা চালায়। ভিডিওটি ওই হামলার সময় ধারণ করা। ফলে ভিডিওটিকে সাজেকের চলমান পরিস্থিতির দৃশ্য দাবিতে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর।
মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভিডিওকে সাজেকে সংঘর্ষ বলে প্রচার
সাজেক ভ্যালিতে নিরাপত্তা বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের দৃশ্য দাবিতে ফেসবুকে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে কয়েকজন শিশু-কিশোরকে গোল হয়ে বসে অস্ত্র নাড়াচাড়া করতে দেখা যায়।
ভিডিওটির কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ‘အဲနီ မိငယ်’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ২৪ সেপ্টেম্বর শেয়ার করা একই ভিডিও পাওয়া যায়। পোস্ট করা ভিডিওতে বার্মিজ ভাষায় লেখা হয়, ‘জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ এড়িয়ে চলতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের স্বাগত জানায় মিইংজানের তরুণেরা।’ এ ছাড়া ভিডিওর উৎস হিসেবে মিইংজান রেভলুশন আর্মির কথা রয়েছে।

আরও অনুসন্ধানে ‘Kyaukse Revolution Army K.R.A’ নামের একটি ফেসবুক পেজেও গত ২২ সেপ্টেম্বর শেয়ার করা একই ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিওতেও বার্মিজ ভাষায়, রেভলুশন আর্মির কথা পাওয়া য়ায়। এ ছাড়া সেখানে এ ধরনের আরও ভিডিও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি সাজেকের পরিস্থিতি বলে প্রচার করা হলেও এর সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ঘটনার যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
মিয়ানমারের পুরোনো ভিডিওকে সাজেকে গোলাগুলির দৃশ্য বলে প্রচার
অপর একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়, রাঙামাটির সাজেকের বাঘাইছড়ি ইউনিয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। একই পোস্টে পর্যটকদের ওপর হামলা, দুই সেনাসদস্য আহত হওয়া এবং কয়েকজন ইউপিডিএফ সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথাও বলা হয়। ভিডিওতে জঙ্গলের মধ্যে কয়েকজন ব্যক্তিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়।
ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেমোক্র্যাটিক ভয়েস অব বার্মার (ডিভিবি) ফেসবুক পেজে গত ৮ জুলাই শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়।

পাশাপাশি এ বিষয়ে এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফাপুন শহরের দিকে অগ্রসর হওয়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) সহযোগী বাহিনীগুলো হামলা চালায়।
সিদ্ধান্ত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে বাধা দিচ্ছে—এমন দাবিগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। মূলত ভিডিওগুলোর মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ ও সামরিক অভিযানের দৃশ্য, মিয়ানমারের সামরিক সংঘাতের পুরোনো ভিডিও এবং ভারতের আসামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পুরোনো ভিডিও। এসব ভিডিওকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা হিসেবে প্রচারের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।









