ফ্যাক্টচেক /মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য বিকৃত করে শেখ হাসিনাকে ফেরাতে উদ্যোগ বলে প্রচার

যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
‘Osman Alamder’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে ২৬ অক্টোবর আলোচিত দাবিতে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘বলছিলাম না, লক্ষণ ভালো না! গরিবের কথা বাসি হলে ফলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর জন্য যা কিছু করতে হয়, তা-ই করবেন যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতেরা।’
ভিডিওটি ৩০ অক্টোবর বেলা ১টা পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার বার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া পোস্টটিতে কয়েক শ কমেন্ট ও শেয়ার রয়েছে। পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য মনে করলেও অনেকে এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
প্রচারিত ২ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরকে কথা বলতে শোনা যায়। তিনি জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রথমবার সেখানে সফর করতে পেরে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, অনেক আমেরিকান সেখানে গিয়ে জায়গাটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক ভালো হয়েছে জানিয়ে সার্জিও গোর বলেন, বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তাঁরা ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লিতে ফিরে কাজ করবেন। পাশাপাশি, দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তবে ওই বক্তব্যের কোথাও গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি সার্জিও গোর।
অনুসন্ধানে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে গত ১৯ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিওতেও সার্জিও গোরকে একই বক্তব্য দিতে শোনা যায়।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘The Tribune’ -এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রথমবারের মতো জম্মু ও কাশ্মীর সফরে এসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর শ্রীনগরে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরকে ‘ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ বলে উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি অঞ্চলটিকে আরও নিরাপদ করে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মাত্রার ভ্রমণ সতর্কতা পুনর্মূল্যায়ন ও শিথিল করার ইঙ্গিত দেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্জিও গোর বলেন, ‘এটি ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সে কারণেই আমি প্রথমবারের মতো এখানে সফর করছি। এটি একটি অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর জায়গা এবং এখানে আসতে পেরে ও এই স্থানটি দেখতে পেরে আমি আনন্দিত। আমাদের মধ্যে খুব ভালো বৈঠক হয়েছে এবং কিছু বিষয় রয়েছে, যা আমরা ওয়াশিংটন ও দিল্লিতে নিয়ে যাব। আলোচনাটি ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং আমরা এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে উন্মুখ।’
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরকে আরও নিরাপদ রাখতে কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভ্রমণ সতর্কতা পর্যালোচনা করবে। উল্লেখ্য, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশটির নাগরিকদের জম্মু ও কাশ্মীরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে লেভেল-৪ বা ‘ভ্রমণ না করার’ সতর্কতা জারি ছিল।
গোর বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সময় সময় ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে এবং সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে। আমি আজ এখানে কোনো বড় ঘোষণা দিতে পারছি না, তবে এটি এমন একটি বিষয়, যা আমরা খতিয়ে দেখব। নয়াদিল্লি, এখানকার মুখ্যমন্ত্রী ও এখানকার সরকার এই অঞ্চলটিকে নিরাপদ রাখা এবং আরও নিরাপদ করে তোলার জন্য কিছু অসাধারণ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আমরা মনে করি।’
সার্জিও গোর আরও বলেন, ‘তাই আমরা খতিয়ে দেখব, এই ভ্রমণ সতর্কতা কমানো যায় কি না। এটি একটি সুন্দর অঞ্চল। আমার মনে হয়, অনেক আমেরিকান এখানে এসে এর সৌন্দর্য ও এখানকার সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করতে পছন্দ করবেন।’

বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাঁদের আলোচনার কথা বলেন। তিনি পর্যটন, উদ্যানপালন ও নতুন অর্থনীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনার কথা তুলে ধরেন।
ওমর আবদুল্লাহ লেখেন, ‘আজ শ্রীনগরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরকে স্বাগত জানাতে পেরে আনন্দিত। জম্মু ও কাশ্মীর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও গভীর করার সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে; বিশেষ করে পর্যটন, উদ্যানপালন এবং নতুন অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রগুলোতে। আমি এই মেলবন্ধন বজায় রাখা এবং আমাদের আলোচনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।’

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে পারস্পরিক আগ্রহের কথা জানিয়ে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরও এক্সে লেখেন, ‘জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর সঙ্গে দেখা করার এবং তাঁর অগ্রাধিকারমূলক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। আমরা কীভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করা যায় এবং তা কীভাবে আমাদের উভয় দেশের জন্য পারস্পরিকভাবে লাভজনক হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছি।’
একই তথ্য দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনেও পাওয়া যায়।

সিদ্ধান্ত
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতেরা পদক্ষেপ নেবেন—এই দাবি বানোয়াট। প্রচারিত ভিডিওতে সার্জিও গোরের বক্তব্য জম্মু ও কাশ্মীর সফর এবং সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকসংক্রান্ত। ভিডিওতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কোনো বক্তব্য নেই।









