Ajker Patrika

ফ্যাক্টচেক /আজারবাইজানে প্রেসিডেন্টের ছবি সরাচ্ছে সেনাবাহিনী—ভিডিওটি এআই নির্মিত

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
আজারবাইজানে প্রেসিডেন্টের ছবি সরাচ্ছে সেনাবাহিনী—ভিডিওটি এআই নির্মিত
আজারবাইজানের সেনাসদস্যদের প্রেসিডেন্টের ছবি সরানোর দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করার কারণে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী রাস্তা থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি সরিয়ে ফেলছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ হক পেইজ’ নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে আলোচিত দাবিতে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। গত ১৫ অক্টোবর রাত ৯টা ৫৬ মিনিটে শেয়ার করা ভিডিওটি ১৬ অক্টোবর দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ২২ লাখ বার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ২২ হাজার ৪০০ রিয়েকশন, ১ হাজার কমেন্ট ও ১ হাজার ৪০০ শেয়ার রয়েছে।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

প্রচারিত ৬ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, সামরিক পোশাক পরা সশস্ত্র দুজন ব্যক্তি রাস্তার পাশে থাকা একটি ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছেন। তাঁদের মুখে মাস্ক বা হেডকভার রয়েছে এবং পিঠে আগ্নেয়াস্ত্র ঝোলানো। তবে ভিডিওতে ডিসপ্লে বোর্ডটি পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পেছনে থাকা একজন ব্যক্তিকেও ‘ভেঙে’ রাস্তায় পড়ে যেতে দেখা যায়, যা সাধারণত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিওর ক্ষেত্রে দেখা যায়।

প্রথমে প্রচারিত দাবির বিষয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরা নিয়ে বিতর্কের খবর পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার দেশটিতে শিক্ষার্থীদের স্কুলে এবং শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে হিজাব পরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে হিজাব পরার কারণে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্কুলের ফটক থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের কান্না এবং শিক্ষকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনাও উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর আজারবাইজানের মন্ত্রিপরিষদ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পোশাকবিধিতে একটি সংশোধনী অনুমোদন করে। সংশোধিত বিধিতে সাধারণ শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা নির্ধারিত ইউনিফর্মের পরিপন্থী পোশাক পরে স্কুলে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যদিও বিধিতে সরাসরি ‘হিজাব’ শব্দটির উল্লেখ নেই, তবে এটি কার্যকরের পর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে ৬ অক্টোবর শিক্ষকদের পোশাক নিয়েও নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়।

হিজাব পরে স্কুলে যেতে বাধা পাওয়া জোহরা হাসানোভা নামের এক শিক্ষিকা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, হিজাব পরা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি বলেন, হিজাব খুলে ফেলা যেমন ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, তেমনি হিজাব পরাটিও তাঁর অধিকার।

এই বিধিনিষেধের প্রতিবাদে দেশটির অন্তত দুটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কারাবন্দী সাংবাদিক পোলাদ আসলানোভও কারাগার থেকে এ আদেশের বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেছেন বলে তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে পাঠানো বার্তার বরাতে জানানো হয়। সেখানে তিনি পোশাকবিধির নামে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।

আজারবাইজানের সরকার এই পদক্ষেপকে ধর্মীয় বিরোধিতার পরিবর্তে শিক্ষা নীতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণ শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অভিন্নতা বজায় রাখাই পোশাকবিধির লক্ষ্য।

আজারবাইজানের সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশটির সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের নামে হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশে বাধা দেওয়া তাদের শিক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।

আজারবাইজানের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ তুরস্কেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে বিধিনিষেধের বিরোধিতা করেন। অনেকে ঘটনাটিকে ১৯৯৭ সালে তুরস্কের বিতর্কিত ‘পোস্ট-মডার্ন ক্যু’ বা সামরিক হস্তক্ষেপের পর হিজাবে নিষেধাজ্ঞার স্মৃতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ নিজ দলের এক সম্মেলনে বলেন, ‘কারও আমাদের জীবনযাত্রার ওপর হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।’ তবে তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে রাস্তা থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে ফেলার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘আরব নিউজ’ কিংবা ‘মিডিল ইস্ট আই’ -এর প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়। তবে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা বিলবোর্ডের ছবির সঙ্গে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের চেহারার সাদৃশ্য রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত আরব নিউজের একটি প্রতিবেদনে আজারবাইজানে হিজাব ইস্যুতে স্কুলগুলোতে অসন্তোষ ও বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩৭ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। তবে দেশটির সেনাবাহিনী রাস্তা থেকে প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি বা বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলছে—এমন কোনো তথ্য ওই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কি না, তা যাচাই করতে ‘ডিপফেক-ও-মেটার’ নামের এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলের সহায়তা নেওয়া হয়। টুলটির বিশ্লেষণে ভিডিওটি ডিজিটাল কারসাজি বা এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৫ শতাংশ বলে দেখা যায়।

এআই বিশ্লেষণ। ছবি: স্ক্রিনশট
এআই বিশ্লেষণ। ছবি: স্ক্রিনশট

সিদ্ধান্ত

আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ নিয়ে বিতর্ক ও প্রতিবাদের খবর পাওয়া গেলেও, এর কারণে দেশটির সেনাবাহিনী রাস্তা থেকে প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি সরিয়ে ফেলছে—এমন ঘটনার সমর্থনে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। আজারবাইজানের হিজাব বিতর্কের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের ছবি সরিয়ে ফেলার ঘটনা যুক্ত করে প্রচারিত ভিডিওটি এআই নির্মিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত