প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার দেশ আজারবাইজানে শিক্ষার্থীদের স্কুলে এবং শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে হিজাব (মুখ খোলা) পরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বজায় রাখার অজুহাতে পোশাকবিধিতে পরিবর্তন আনার পর থেকে এই পরিস্থিতির সূচনা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, হিজাব পরার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে স্কুলের ফটক থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ সময় অনেক শিক্ষার্থীকে কান্নায় ভেঙে পড়তে এবং শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর আজারবাইজান সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পোশাকবিধিতে একটি সংশোধনী অনুমোদন করে। সংশোধিত এই বিধিতে স্পষ্ট বলা হয়, সাধারণ শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা নির্ধারিত ইউনিফর্মের পরিপন্থী কোনো পোশাক পরে স্কুলে আসা যাবে না।
যদিও সরকারি ওই নিয়মে সরাসরি ‘হিজাব’ শব্দটির উল্লেখ নেই, তবে এটি বাস্তবায়নের পরপরই দেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরিহিতদের প্রবেশ আটকে দেয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে ৬ অক্টোবর শিক্ষকদের পেশাদারি ও পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিয়ে তাদের জন্যও নতুন পোশাক নির্দেশিকা জারি করা হয়।
হিজাব পরে স্কুলে যেতে বাধা পাওয়া জোহরা হাসানোভা নামের এক শিক্ষিকা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি খুবই মর্মাহত ও অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত। হিজাব পরাটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আজ আমি যদি হিজাব খুলে ফেলতে চাই, সেটাও যেমন আমার নিজের পছন্দ হওয়া উচিত, তেমনি হিজাব পরাটাও আমার অধিকার।’
এই বিধিনিষেধের প্রতিবাদে দেশের অন্তত দুটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছে। এমনকি কারাবন্দী সাংবাদিক পোলাদ আসলানোভ কারাগার থেকেই এই আদেশের বিরুদ্ধে অনশন ধর্মঘট শুরু করেছেন। স্ত্রীর মাধ্যমে পাঠানো বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, পোশাকবিধির নামে নাগরিকদের সাংঘর্ষিক ও মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে।
আজারবাইজানের সরকার তাদের এই পদক্ষেপকে ধর্মীয় বিরোধিতার পরিবর্তে শিক্ষা নীতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘এপিএ’ জানিয়েছে, সাধারণ শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অভিন্নতা বজায় রাখাই এই পোশাকবিধির প্রধান লক্ষ্য।
আজারবাইজানের সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজ্য থেকে ধর্মকে পৃথক রাখা হয়েছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে দেশটির মানবাধিকারকর্মীরা আঙুল তুলছেন সংবিধানের ৪৮ ও ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের দিকে, যেখানে স্পষ্ট বলা আছে:
অনুচ্ছেদ ৪৮: প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিশ্বাস অনুসরণের অধিকার নিশ্চিত করে।
অনুচ্ছেদ ৪২: প্রতিটি নাগরিকের জন্য শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করে।
সমালোচকদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখার নামে হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে না দেওয়া তাদের শিক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।
আজারবাইজানের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ তুরস্কেও। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে এই আদেশের তীব্র বিরোধিতা করেন। অনেকে এটিকে ১৯৯৭ সালে তুরস্কের বিতর্কিত ‘পোস্ট-মডার্ন ক্যু’ বা সামরিক হস্তক্ষেপের পরবর্তী সময়ে হিজাব নিষেধাজ্ঞার স্মৃতি হিসেবে দেখছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ নাম না করে তুরস্কের প্রতি কিছুটা কড়া বার্তা দিয়েছেন। নিজ দলের এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘কারও আমাদের জীবনযাত্রার ওপর হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।’
যদিও আঙ্কারা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলিয়েভের মন্তব্যের জবাব দেওয়া হয়নি, তবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন।
ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত অক্ষ ও ভারতের সাথে দূরত্ব: আজারবাইজানের বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ফলে আজারবাইজানের পররাষ্ট্রনীতিতে এক বৈচিত্র্যময় চিত্র ফুটে উঠেছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি ইসরায়েলের সাথে দেশটি গড়ে তুলেছে গভীর ও বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারত্ব, অন্যদিকে কৌশলগত পার্থক্যের কারণে আঞ্চলিক শক্তি ভারতের সাথে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট টানাপোড়েন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক মিত্রতার সমীকরণে বাকু এখন এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
১৯৯০-এর দশক থেকে আজারবাইজান ও ইসরায়েলের মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে। গত কয়েক দশকে বাকু ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল থেকে কোটি কোটি ডলারের আধুনিক ড্রোন, নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ‘লোইটারিং মিউনিশন’ বা ড্রোন বোমা এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে আজারবাইজান সামরিক বাহিনী।
সামরিক সমর্থনের পাশাপাশি জ্বালানি ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশই আসে আজারবাইজান থেকে। এই তেল মূলত ‘বাকু-তিবিলিসি-জেহান’ পাইপলাইনের মাধ্যমে পৌঁছায়।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের অগ্রগতির সাক্ষী হয়েছে দুই দেশ। ২০২৩ সালে তেল আবিবে আজারবাইজান তাদের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস উদ্বোধন করে। এ ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান নিয়ে উভয় দেশের পারস্পরিক উদ্বেগ এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জোরালো করেছে।
তবে এই উষ্ণ সম্পর্কের মধ্যেও কিছু সাময়িক জটিলতা দেখা গেছে। আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সঙ্গে তেল আবিবের দূরত্বের কারণে কখনো কখনো বাকুর ওপর চাপ তৈরি হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুনে ইসরায়েল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আর্মেনীয় হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ (জেনোসাইড) হিসেবে স্বীকৃতি দিলে আজারবাইজান সরকারিভাবে তার তীব্র সমালোচনা করে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি ভারতের সঙ্গে বাকুর সম্পর্ক বেশ জটিল রূপ নিয়েছে। এই টানাপোড়েনের মূলে রয়েছে নাগোরনো-কারাবাখ ইস্যুকে কেন্দ্র করে আর্মেনিয়ার সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক।
ভারত সম্প্রতি আর্মেনিয়াকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করতে একাধিক আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘পিনাক’ মাল্টি-ব্যারেল রকেট লাঞ্চার। বাকু ভারতের এই পদক্ষেপকে সরাসরি তাদের প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন অবস্থান হিসেবে দেখছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান ফ্যাক্টর। আজারবাইজানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এক বক্তব্যে অভিযোগ করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাকুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণে ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধমূলক’ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেও ভারত ও আজারবাইজানের মধ্যে অর্থনৈতিক ও ট্রানজিট সহযোগিতার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অর্থায়নে গড়ে ওঠা ইরানের ‘চাবাহার বন্দর’-এর সঙ্গে আজারবাইজানকে যুক্ত করে ‘ট্রান্স-কাস্পিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট রুট’ বা মিডল করিডর ধরে একটি নতুন বাণিজ্যিক রুট চালু করা সম্ভব।
তবে বিদ্যমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধ ও অবিশ্বাসের কারণে আপাতত এই সমন্বিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বাস্তবায়ন থমকে রয়েছে।