
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। বুধবার (১৩ মে) রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এখন থেকে নির্ধারিত সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং পশুচিকিৎসকের দেওয়া ফিটনেস সনদ ছাড়া গরু, ষাঁড় বা মহিষের মতো কোনো পশু জবাই করা যাবে না। ১৪ বছরের বেশি বয়সী পশু কোরবানি দিতে হবে এবং কোনো পশু প্রজননে অক্ষম বা অন্যান্য কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার সনদ নিতে হবে। এই নিয়ম অমান্য করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই নির্দেশনা রাজ্যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রকাশ্যে গবাদিপশুর মাংস কাটা ও বিক্রিতে ১৯৫০ সালের ‘পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’ নিয়ে যখন পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যজুড়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলমান, ঠিক সেই মুহূর্তে নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে, এটি শুভেন্দু অধিকারীর গরুর মাংস খাওয়ার দৃশ্য।
সব সময় কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি ও গো-রক্ষার পক্ষে কথা বলা এই বিজেপি নেতার এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ট্রেন্ডে পরিণত হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ ও লাখ লাখ শেয়ার হচ্ছে।

‘Face the People News-ফেইস দ্যা পিপল নিউজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ১৮ মে রাত ৮টায় ‘শুভেন্দু খেলেন ৩ বাটি গরুর মাংস!’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়, যা সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। ভিডিওটি আজ ২৩ মে বেলা ১১টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখবার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ৮ লাখ ৭০ হাজার রিঅ্যাকশন, ১৯ হাজার ১০০ কমেন্ট ও ১ লাখ ৪৯ হাজার শেয়ার রয়েছে।
‘Chowkidaar Express’ নামের একটি পেজ থেকে ইংরেজি ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘নতুন বিজেপি-শাসিত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী একজন গরুর মাংস ভক্ষণকারী।’
এ ছাড়া ‘tbh.newsbd’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও একই ভিডিও শেয়ার করে শুভেন্দুকে তীব্র কটাক্ষ ও ট্রোল করে পোস্ট করা হয়েছে।
এসব ভিডিওর কমেন্ট পর্যালোচনা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ মুসলিমবিদ্বেষী শুভেন্দুর এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে রীতিমতো ভর্ৎসনা করেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন ভিডিওটি ঠিকভাবে এডিট করা হয়নি, হাতের শাঁখা দেখা যাচ্ছে।
এই দাবিতে ভাইরাল আরও কয়েকটি ভিডিও আছে এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে।
আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমেই ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি https://perma.cc/Y6JA-7M87 পর্যবেক্ষণ করে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম। এটি মূলত দুটি আলাদা ভিডিও জোড়া দিয়ে একটি ভিডিও বানানো হয়েছে। ভিডিওটির প্রথম অংশে দেখা যায়, শুভেন্দু অধিকারী একটি ঘরের ভেতর টেবিলে বসে মাংস সদৃশ খাবার খাচ্ছেন এবং একজন নারী খাবার পরিবেশন করছেন। খেতে খেতে শুভেন্দুকে হাসিমুখে সেই নারীর উদ্দেশে কিছু একটা বলতে দেখা যায়। ভিডিওটিতে অন্য এক টেবিলে আরেকজনের খাওয়ার দৃশ্য রয়েছে।
এ ছাড়া ওই ভিডিওর পরের অংশে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘শুভেন্দু আমার সামনে কোরবানির দিনে এক বাটি না, দুই বাটি না, তিন বাটি গরুর মাংস খেয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুরে শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে। আবার রাতে খাবে বলে টিফিন ক্যারিয়ারে করে মাংস বয়ে নিয়ে গেছে।’
তবে ভিডিওটি ভালো করে পর্যবেক্ষণে একটি দৃশ্যে অসংগতি লক্ষ করা যায়। ভিডিওতে শুভেন্দু অধিকারীর পাশে দাঁড়িয়ে যিনি খাবার পরিবেশন করছেন, তাঁর হাতে ‘শাঁখা’ পরা রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) বিবাহিত নারীরা সাধারণত হাতে শাঁখা পরেন। আর হিন্দু পরিবারে গরুর মাংস রান্না ও খাওয়ার প্রচলন নেই। ফলে সনাতনী নারীর পরিবেশনে মুসলিম বাড়িতে কোরবানির মাংস খাওয়ার দাবিটি সাংঘর্ষিক।

প্রচারিত ভিডিওতে কথা বলা ব্যক্তির খোঁজে অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ব্যক্তির নাম সৈয়দ আলী আফজাল চাঁদ, যিনি পশ্চিমবঙ্গের একজন পরিচিত আইনজীবী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ‘All India Yuba Trinomool Congress’ নামের একটি পেজে তাঁর মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়। সেখানে তিনি শুভেন্দু অধিকারীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আজ সে সনাতনী হিন্দু, হিন্দু করছে। এই শুভেন্দু আমার সামনে কোরবানির দিনে এক বাটি না, দুই বাটি না, তিন বাটি গরুর মাংস খেয়েছে।’
এ সময় ক্যামেরার পেছন থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘কয় বাটি?’ উত্তরে আলী আফজাল বলেন, ‘তিন বাটি।’ এরপর আবার জিজ্ঞেস করা হয়, ‘কোথায় খেয়েছে?’ জবাবে আলী আফজাল বলেন, ‘পশ্চিম মেদিনীপুরে শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আবার রাতে খাবে বলে টিফিন ক্যারিয়ারে করে মাংস বয়ে নিয়ে গেছে।’ এ সময় আলী আফজাল আরও বলেন, ‘সাহস থাকলে শুভেন্দু আমার সামনে ভজাবে।’

তবে সৈয়দ আলী আফজাল চাঁদের ওই বক্তব্যে শুভেন্দু অধিকারী গরুর মাংস খাচ্ছেন—এমন কোনো ছবি বা ভিডিও পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া একই দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন সময় ও ব্যক্তির আরও কিছু ভিডিও ( ১, ২ , ৩) পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে, চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ‘Gada Times - गाड़ा টাইমস’ নামের একটি পেজে শুভেন্দুর খাওয়ার এই ভিডিওটি পাওয়া যায়, যেখানে শুভেন্দুর মাংস খাওয়ার কথা বলা হলেও সেটি কিসের মাংস—তার কোনো উল্লেখ নেই।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে, গত ১৯ মে ‘The Muslim Matter India’ নামের একটি এক্স অ্যাকাইন্টে ভিডিওটি শেয়ার করে ইংরেজি ক্যাপশনে বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে এক ব্যক্তি দাবি করছেন যে গত বছর (বা তার আগের বছর) ঈদুল আজহার সময় পশ্চিম মেদিনীপুরে শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে আয়োজিত এক ভোজসভায় শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে গরুর মাংস খেয়েছিলেন।
ওই পোস্টে আরও বলা হয়, দাবি অনুযায়ী, তিনি এক-দুই বাটি নয়, তিন বাটি গরুর মাংস খেয়েছিলেন এবং কিছু সঙ্গে করে নিয়েও গিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো—কোরবানির গরুর মাংস কি সত্যিই শুভেন্দু অধিকারী খেয়েছিলেন?
একই দিনে ভিডিওটি শেয়ার করে ‘Somnath Bharti सोमनाथ भारती’ নামের অপর এক অ্যাকাউন্টে বলা হয়, যদি এটি সত্যি হয়, তবে এটি আবারও ভারতীয় জনতা পাটির (বিজেপি) মুখোশ খুলে দিল।

এমনকি জাতীয় দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেলে গত ১৮ মে ‘হিন্দুত্ববাদের বুলি আওড়ানো শুভেন্দু কি সত্যিই কোরবানির গরুর মাংস খেয়েছেন’ শিরোনামে প্রকাশিত এক ভিডিও প্রতিবেদনেও জানানো হয় যে, এই দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। অন্যদিকে‘দৈনিক ইনকিলাব’-এ গত বছরের ১১ জুন ‘শুভেন্দু খেলেন ৩ বাটি গরুর মাংস! ভিডিও ভাইরাল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যবহৃত বক্তব্যের সঙ্গে আলি ফজল চাঁদের দাবির মিল রয়েছে।
এ ছাড়া খেয়াল করলে দেখা যায়, শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে এমন দাবি নতুন নয়। এর আগেও নানা সময়ে অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে অভিযোগ করেছেন। তবে দাবির পক্ষে কখনো শক্ত প্রমাণ হাজির করা হয়নি।
মূলত সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভোট যাদের প্রধান ভরসা, এবারের নির্বাচনে সেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি হলেও শুভেন্দু অধিকারী এক সময় ওই দলের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন। ২০২০ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। সে হিসাবে সৈয়দ আলি আফজালের দাবি যদি সঠিকও হয় তাহলে সে সম্পর্কিত কোনো ভিডিও সাম্প্রতিক সময়ের হওয়ার সুযোগ নেই। শুভেন্দু অধিকারী আসলেই কখনো গরুর মাংস খেয়েছেন কিনা বা ভাইরাল ভিডিওর খাওয়ার দৃশ্যটি ঠিক কোথায়, কখন এবং কোন পরিস্থিতিতে ধারণ করা—তার কোনো স্বাধীন ও অকাট্য প্রমাণ আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিমের পক্ষে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গরুর মাংস খাওয়ার ভিডিও প্রচারিত দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো তথ্যপ্রমাণ না থাকায় দাবিটি নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। ভিডিওর দাবিটি বিভ্রান্তিকর।

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট আনাক ক্রাকাতাউয়ে একাধিকবার অগ্ন্যুৎপাতে ঘটেছে। এ প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, এগুলো সেই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের দৃশ্য।
২ দিন আগে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটোরে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের এক কর্মীকে গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে—এমন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। প্রচারিত ভিডিওতে এ ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের দায়ী করা হয়েছে।
৩ দিন আগে
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অস্ত্র চালানোর দৃশ্য-সংবলিত একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে এটিকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দাবি করা হচ্ছে।
৩ দিন আগে
‘Mohammad Asif Uddin’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হয়, ‘অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে বাবার চোখের সামনেই বিএনপির সন্ত্রাসীদের নির্মম নির্যাতনের শিকার ছাত্রলীগ কর্মী! মনে রেখো বাংলাদেশ।’
৪ দিন আগে