Ajker Patrika

রুশ বিপ্লব ও মানুষের শোষণ মুক্তির স্বপ্ন

আহমেদ শমসের, সাংবাদিক 
রুশ বিপ্লব ও  মানুষের শোষণ  মুক্তির স্বপ্ন

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে রুশ দেশে পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবরে সূচিত হয়েছিল বলে পৃথিবীর প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবটি ‘অক্টোবর বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অবশ্য পরে নতুন গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী তারিখটি পড়ে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর। তাই পরবর্তী সময়ে অক্টোবর বিপ্লব নভেম্বর বিপ্লব হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

যে কারও মনে স্বাভাবিক প্রশ্ন, একই ঘটনা দুই নামে পরিচিত বা চিহ্নিত কেন? এমন অদ্ভুত ঘটনা পৃথিবীর আর কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার ক্ষেত্রে ঘটেনি। সময় বদলে গেছে—এমন নজিরও বিরল। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মাস, তারিখ, দিনক্ষণের আমূল বদলে যাওয়ার এ ঘটনা ঘটেছে ক্যালেন্ডারের কারসাজিতে। রুশ বিপ্লব যখন হয়, তখন সে দেশে দোর্দণ্ড প্রতাপে ক্ষমতাসীন জারতন্ত্র। ওজনে-অহংকারে সে নিজেকে অন্যের সঙ্গে মেলাতে রাজি নয়। সবকিছুতেই অন্যের চেয়ে আলাদা পথে চলতেই তার শ্লাঘা। ফলে সময়ের গণনাতেও সেই সময়ের রাশিয়া ছিল ভিন্ন পথে। এখন থেকে ১০৫ বছর আগে দুই ধরনের ক্যালেন্ডারের অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীতে—গরিয়ান ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। রুশ বিপ্লব যখন ঘটে, সে সময় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই মেনে চলা হতো রাশিয়ায়। একই সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চালু ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। বিপ্লবের সময়কাল ছিল ২৫ অক্টোবর। আর সেটাই জুলিয়ানের দৌলতে এ দেশে ৭ নভেম্বর।

এখন রাশিয়াসহ সব দেশেই এই বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় নভেম্বর মাসে। রাশিয়া এখন আর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে আটকে নেই।জুলিয়ানের হাত ধরেই এখন তার পথ চলা। তবে ক্যালেন্ডার বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থারও বদল হয়েছে; বলা যায়, পতন হয়েছে সমাজতন্ত্রের। অক্টোবর বা নভেম্বর বিপ্লব দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

বিভিন্ন যুগে মানবজাতির ওপর চেপে বসা শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের অবসানের লক্ষ্যে সমাজের নিপীড়িত শ্রেণি বিপ্লবী অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে। রোমে অভিজাত শ্রেণির দাস নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ, ফ্রান্সে সর্বহারা শ্রেণির প্যারি কমিউন ছাড়াও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত শ্রেণি লড়াই-সংগ্রাম করেছে। কিন্তু লেনিনের নেতৃত্বে নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো সর্বহারা শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পেত্রোগ্রাদ (সেন্ট পিটার্সবার্গ) শহরে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টির এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবটির সূচনা করেছিল বিপ্লবী শ্রমিক-জনতা এবং সৈনিকেরা।

সৈনিকদের অধিকাংশ ছিল রাশিয়ার গরিব কৃষক শ্রেণি থেকে আসা। এক অর্থে তারা ছিল সেনা উর্দি পরা কৃষক। এ ছাড়া পেত্রোগ্রাদের শ্রমিক-সৈনিক অভ্যুত্থান নাড়া দিয়েছিল পুরো রাশিয়াকে। অভ্যুত্থানে রাশিয়ার গরিব কৃষকেরা যোগ দিয়েছিলেন ব্যাপকভাবে। অক্টোবর বিপ্লবের সাত মাস আগে মার্চের ৮ তারিখে পেত্রোগ্রাদ শহরের রাজপথ প্রকম্পিত করেছিল রুটির দাবিতে ভুখা মানুষেরা। তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে বিপুলসংখ্যক বিপ্লবী কারখানার শ্রমিক। জারের পুলিশের গুলির মুখেও তারা রাজপথ আঁকড়ে থাকে।

১০ মার্চের মধ্যে বিক্ষোভ অভ্যুত্থানে রূপ লাভ করে। পেত্রোগ্রাদের বহু কারখানায় গড়ে ওঠে শ্রমিক সোভিয়েত। এমন সংগঠনের সঙ্গে শ্রমিকেরা পরিচিত। ১২ বছর আগে ১৯০৫ সালের জারবিরোধী বিপ্লবে এমন সোভিয়েত গড়ে উঠেছিল বহু কারখানায়। ১৯১৭ সালের ১১ মার্চ এই বিক্ষোভ দমনে নামানো হয় পেত্রোগ্রাদ গ্যারিসনের সেনা দলকে। প্রথম দিকে গুলিও চালায় তারা। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের দমাতে পারে না; বরং সৈনিকদের মনোবলে চিড় ধরে। জার দ্বিতীয় নিকোলাস তাঁর রাষ্ট্রীয় দুমা (পরামর্শ সভা) ভেঙে দেন, যা তিনি গঠন করেছিলেন ১৯০৫ সালের বিপ্লবের পর। তাতে কাজ হয় না। সৈনিকেরা যোগ দিতে থাকে অভ্যুত্থানকারী শ্রমিক-জনতার সঙ্গে। পরদিন ১২ মার্চ।

রোমানভ রাজতন্ত্রের শেষ রক্ষাব্যূহ রাশিয়ার রাজধানী পেত্রোগ্রাদ সেনা গ্যারিসনের বিভিন্ন রেজিমেন্টের সৈনিকেরা দলে দলে যোগ দেয় অভ্যুত্থানে। রাতারাতি গড়ে উঠতে থাকে সৈনিক সোভিয়েত। এক দিকে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের, অন্যদিকে উত্থান ঘটে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের নিয়ে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত। সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয় পেত্রোগ্রাদের শ্রমিক ও সৈনিক সোভিয়েতের। তাই বলা যায় রুশ রাজতন্ত্রের পতনের পর দুটি কর্তৃত্বের উদ্ভব ঘটে। পুঁজিপতি বুর্জোয়া ও সর্বহারা শ্রেণির কর্তৃত্ব। এই বিশেষ পরিস্থিতি শ্রমিক ও সৈনিক সোভিয়েত নভেম্বর বিপ্লবের বিজয়ী হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তারপর পৃথিবীজুড়ে পরিবর্তনের যে ঢেউ উঠেছিল, শোষণমুক্ত বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শোষিত মানুষের যে স্বপ্ন ও সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপর্যয় মানে কি শোষণ মুক্তির স্বপ্নের সমাপ্তি? মানুষের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রাম যে গতি লাভ করেছিল নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে, তা নতুন কোনো পথে অগ্রসর হবে বলে আশা ছাড়েনি শ্রমজীবী বঞ্চিত মানুষ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

শিক্ষার্থীর বাসায় মিলল গৃহশিক্ষিকার বস্তাবন্দী মরদেহ

চিকিৎসক দম্পতির সন্তানের মৃত্যু: ‘কল দিয়ে ডাক্তার আশীষ স্যারের পা ধরেছি, তাও তিনি আসবেন না’

সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষিকার মৃত্যুর খবর শুনে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

বিদ্যুৎ বিভাগের নতুন সচিব মিরানা মাহরুখ

সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি: প্রধানমন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত