বছর ত্রিশেক আগের কথা বলছি। সে সময় গ্রামের বাড়িতে যাঁদের পুকুর ছিল, তাঁরা চার-পাঁচটা করে হাঁস লালনপালন করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিল ও হাওর এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে হাঁস লালনপালন শুরু হয়। কৃষক পর্যায়ে হাঁস লালনপালনের বিকাশ দেখে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ডাক ভ্যালু চেইন নিয়ে কাজ শুরু করে। আমি গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ এলাকার হাঁস পালন নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন তৈরি করেছি। দেখেছি হাঁস সেসব অঞ্চলের অনেক বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।
বছর পাঁচেক আগেও চলনবিল এলাকায় হাঁস চাষের প্রসার নিয়ে কাজ করেছি। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার খুটিগাছা গ্রামের কথাই বলি। ছোট্ট একটা গ্রাম। চলনবিলের এসব এলাকায় শুকনো মৌসুমে যে রূপ দেখা যায়, বর্ষায় ঠিক তার উল্টো। বিলের পানিতে চারপাশ হয়ে ওঠে ডুবুডুবু। সেও এক মনোহর প্রাকৃতিক রূপ। গ্রামের চারপাশ ঘুরে দেখি সেখানে ধান ও মাছের পাশাপাশি আরেক অর্থকরী খাত হচ্ছে হাঁস। গ্রামের তরুণেরা তো বটেই, গৃহিণীরাও যুক্ত হয়েছেন হাঁস পালনে। শুধু খুটিগাছা নয়, চলনবিলের আশপাশের অন্য সব গ্রামের অর্থনৈতিক চিত্রও পাল্টে দিয়েছে হাঁস।
কথা হয়েছিল খুটিগাছার জাহানারা খাতুনের সঙ্গে। তিনি দিনমজুর স্বামীর বউ হয়ে এসেছিলেন এই গ্রামে। স্বামীর কোনো কৃষিজমি নেই। পরের জমিতে কাজ করে যে আয়, তাতে সংসার চালানো কঠিন ছিল। কোনো দিন দুই বেলা, কোনো দিন এক বেলা, আবার কোনো দিন চেয়েচিন্তে খেয়ে না-খেয়েও দিন পার করেছেন। স্বামীর পাশাপাশি কিছু একটা করে সংসারের আয় বাড়ানোর চিন্তা ছিল তাঁর সব সময়। কিন্তু কী করবেন, নেই লেখাপড়া, গ্রামে নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো উপায়। একদিন গ্রামের আবদুল আলিমের হাঁসের খামার দেখে মনে হলো তিনিও তো হাঁস পালতে পারেন। পাঁচ-ছয়টা হাঁসের বাচ্চা দিয়ে শুরু করলেও খুব কম সময়ে হাঁসের সংখ্যা হাজারে পৌঁছায়। চার বছরে পাল্টে গেছে তাঁর আর্থসামাজিক অবস্থা। কৃষিজমি কিনেছেন ১০ কাঠা। বড় ছেলেটা স্কুলে যায়। হিসাব করে দেখালেন মাসে আয় থাকে ১৫ হাজার টাকার বেশি। গ্রামের একজন নারী ঘরে বসেই পাল্টে নিয়েছেন নিজেকে। পাল্টে দিয়েছেন সমাজ ও পরিবারকে। তিনি এখন পরিবারের একমাত্র ভরসার জায়গা।
খুটিগাছা গ্রামের শুধু জাহানারাই নন, কথা হলো সাজু আক্তার নামের আরও এক নারীর সঙ্গে। তিনিও জানালেন তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। অনেকটা জাহানারার মতোই। হাঁস পাল্টে দিয়েছে তাঁদের জীবন। সাজু আক্তারের আগ্রহ বেশি রাজহাঁস পালনে। জানালেন রাজহাঁস পালনে লাভটা বেশি। সবচেয়ে বড় কথা রাজহাঁসের রোগবালাই কম হয়। এলাকাটির সঙ্গে হাওরাঞ্চলের তেমন তফাত নেই। গ্রামের ভেতর দিয়ে আশপাশের ডোবা রাস্তায় হাঁসের ঝাঁকের দেখা মেলে। ছোট-বড় অসংখ্য খামার গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু তাড়াশ উপজেলাতেই হাঁসের খামার রয়েছে প্রায় ৮০০। হাঁস পালন করে জাহানারা ও সাজুর মতো বহু অভাবী পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে। এখন অনেকেই বছরের পুরোটা সময় হাঁস পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর কাজেও নিয়োজিত রয়েছেন কেউ কেউ। আবার অনেকেই হাঁস পালন করতে ছুটে বেড়ান দূরদূরান্তে। সব মিলিয়ে স্থানীয় মানুষের আর্থসামাজিক পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে হাঁস।
একই গ্রামের আবদুল আলিমের ৩০ বছর ধরে হাঁসের খামার। এর আগে ছিলেন কৃষিশ্রমিক। হাঁস পালনের আয় দিয়েই কিনেছেন ৭ বিঘা জমি। ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। এলাকার শত শত হাঁসের খামারে ভালোমানের বাচ্চা পাওয়া একসময় অনিশ্চিত ছিল। সেই অনিশ্চয়তা ঘোচাতে স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকটি হ্যাচারি গড়ে উঠেছে। যেখান থেকে মানসম্মত হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। একেবারেই স্থানীয় টেকসই প্রযুক্তি হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা ফোটাচ্ছেন আমির হোসেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে নব্বইয়ের দশকেই আপনাদের সামনে প্রতিবেদন তুলে ধরেছিলাম তুষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের কার্যক্রম নিয়ে। সেই একই
পদ্ধতি ব্যবহার করে সাফল্যের মুখ দেখছেন অনেকেই। আমির হোসেন তাঁদেরই একজন। হাজার হাজার ডিমের বাচ্চা ফোটাচ্ছেন। তাঁর শুরুটাও ছিল শূন্য থেকে।
আরেক শিক্ষিত তরুণ রবিউল ইসলাম। বর্ষা মৌসুমে তিন মাস হাঁস পালেন। তিনি জানিয়েছিলেন প্রতিবছর তিন মাসে ৫০০ হাঁস পালন করে তাঁর লাভ থাকে কম করে হলেও ১ লাখ টাকা।
একই গ্রামের এই মানুষগুলোর সাফল্যের গল্প জড়িয়ে আছে একটির সঙ্গে অন্যটি। ডাক ভ্যালু চেইন তথা হাঁস পাল্টে দিয়েছে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা। মনে পড়ছে, ২০১২ সালে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে হাওরাঞ্চলের হাঁস পালন নিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম। বোরো মৌসুমের ধান আবাদ শুরু হওয়ার পর থেকে হাওরাঞ্চলের সম্পদের তালিকায় ধান আর মাছের পরপরই আসে হাঁস। হাওরের পানিতে চরে বেড়ায় হাঁস। প্রাকৃতিকভাবেই নিশ্চিত হয় খাদ্যের জোগান। যখন বাণিজ্যিক হাঁস পালনের ধারণা এল, তখন দেশে হাঁস পালনের এক অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এল হাওরাঞ্চল। বলা যায়, নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিকভাবে দেশের হাওরবেষ্টিত ছয় জেলায় কমবেশি হাঁস পালন শুরু হয়। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে হাওরকে কেন্দ্র করে রয়েছে কয়েক হাজার হাঁসের খামার।
চীনে হাঁসের মাংসের খুব চাহিদা। বছর চারেক আগে চীনের বেশ কয়েকটি হাঁসের খামার ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। হাঁস পালনে জলাশয় বা পানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসছে চীন। সেখানে খামার ব্যবস্থাপনা একটা চেইন মেনে চলে। একটা কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ছোট থেকে মাঝারি খামারিরা তাঁদের হাঁস লালনপালন করেন। চীনের গোয়াংডং প্রদেশের শিংশিনে দেখেছি উদ্যোক্তার মাধ্যমে মাংসের হাঁস উৎপাদন করছে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি। দ্রুত আর্থিক সাফল্যও অর্জন করছে তারা। পোলট্রি মুরগির মতো খোলা শেডে হাঁস লালনপালন করে তারা। নিয়ম করে প্রাকৃতিক কিংবা তৈরি করা পুকুরে হাঁস বিচরণের প্রয়োজন নেই। নেই শুষ্ক মৌসুমে ঘরে হাঁস রক্ষণাবেক্ষণের মাথাব্যথা। অন্যদিকে তেমন কোনো কারিগরি উৎকর্ষ নেই, সাধারণ শেডে বাঁশ, কাঠ বা নেটের পাটাতনের ওপর মুরগির মতোই পালন হচ্ছে হাঁস।
পানি ছাড়া চীনের ওই জাতের হাঁসের মতো আমাদের দেশের উপযোগী হাঁসের জাত উৎপাদন করা যেতে পারে। এ ছাড়া বেশি ডিম দেবে কিন্তু রোগবালাই কম হবে, এমন জাত উদ্ভাবন প্রয়োজন। হাঁস হতে পারে আমাদের প্রোটিনের চাহিদা পূরণের সম্ভাবনাময় একটা খাত।
প্রতিটি সম্ভাবনার পাশাপাশি থাকে ঝুঁকি। হাঁস পালনের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হচ্ছে এর রোগবালাই। খামারে রোগবালাই দেখা দিলে এক দিনেই হাজার হাজার হাঁস মরে যায়—এমন দৃশ্যও দেখেছি। তবে সচেতন হলে সব ঝুঁকিই কমবেশি এড়ানো সম্ভব। এ জন্য হাঁসের রোগবালাই সম্পর্কে জেনে-বুঝে, প্রাথমিক ধারণা নিয়ে লালনপালন করা উচিত। এ ক্ষেত্রে সরকারের দপ্তরগুলোরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। মাংস ও ডিম উপযোগী পৃথক হাঁসের জাত উন্নয়নের জন্য প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। হাঁসকে ঘিরে তৈরি হতে পারে নতুন বাজার, যা টেকসই করবে আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে।
লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধি খুব পছন্দ করতেন এবং নিয়মিত ব্যবহার করতেন। সুগন্ধির প্রতি প্রিয় নবী (সা.)-এর বিশেষ অনুরাগ ছিল। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘চারটি বস্তু সব নবীর সুন্নত—আতর, বিয়ে, মেসওয়াক ও লজ্জাস্থান আবৃত রাখা।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৪৭৮)
২৪ দিন আগে
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।
০৬ অক্টোবর ২০২৫
‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর...
১২ জুন ২০২৫
ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯ মে ২০২৫