Ajker Patrika

আল জাজিরার প্রতিবেদন /প্রবল হচ্ছে এল নিনো: বন্যা–খরা ও রোগব্যাধির চরম ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ ৬ দেশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
প্রবল হচ্ছে এল নিনো: বন্যা–খরা ও রোগব্যাধির চরম ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ ৬ দেশ
ছবি: এএফপি

দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকা এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতি পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভয়াবহ বন্যা, রোগব্যাধি এবং খরার হুমকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

গতকাল সোমবার প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় সংস্থাটি জানায়, পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। এসব দেশের কয়েকটি ইতোমধ্যেই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আইআরসির জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বব কিচেন বলেন, ‘আমরা একসাথে কয়েকটি জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখছি। যেসব এলাকার আরেকটি ধাক্কা সামলানোর মতো ন্যূনতম সক্ষমতা নেই, মূলত তারাই এখন নিশানা বা বিপদের মুখে রয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার গত ৯ জুলাই জানায়, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। ১৯৫০ সালের পর থেকে এটি অন্যতম শক্তিশালী রূপ নেওয়ার ৮১ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব মূলত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর আগে জুলাইয়ের শুরুতে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছিল, এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি আরও দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সোয়েন তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে বলেন, বছরের এই সময়ে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি এটিকে ‘বিশ্বের জন্য এক বিশাল পরিণতির এক বিরাট ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবে আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর জনগণ ইতোমধ্যেই খরা, সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ বাজেট কমে যাওয়ার কারণে চরম চাপে রয়েছে। ফলে নতুন একটি জলবায়ুগত বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা তাদের খুবই সীমিত।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রার একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর ঘটে। স্বাভাবিক অবস্থায় বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এই বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি পুরো প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর ফলে বিশ্বের কোনো অঞ্চলে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত হয়, আবার কোথাও বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পূর্ব আফ্রিকায় এর অর্থ হলো বছরের মাঝামাঝি সময়ে শুষ্ক আবহাওয়া এবং পরে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে অতিরিক্ত আর্দ্র ও বৃষ্টিপূর্ণ আবহাওয়া। আবহাওয়াবিদদের মতে, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রার আরেকটি সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণে চলতি বছর এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

সোমালিয়ায় এ বছর ভারী বৃষ্টির কারণে রাজধানী মোগাদিশুর বিভিন্ন এলাকা ইতোমধ্যেই বারবার প্লাবিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত আগাম সতর্কীকরণ সংস্থা এফইডব্লিউএস নেট জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষ দিকে যদি ১৯৯৭ বা ২০২৩ সালের মতো বড় ধরনের বন্যা হয়, তবে সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে দুর্ভিক্ষের বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হবে। সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ওই সময় এল নিনো এবং ভারত মহাসাগরের সম্মিলিত প্রভাবে কৃষিজমি তলিয়ে গিয়েছিল এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।

কেনিয়া, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও বাড়ছে উদ্বেগ

কেনিয়ার আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, বছরের বাকি সময়জুড়ে এল নিনো বজায় থাকার ৮০ থেকে ৮২ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। বছরের মাঝামাঝি শুষ্ক আবহাওয়ার পর অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় দেশটি ইতোমধ্যেই জাতীয় দুর্যোগ পরিকল্পনা সক্রিয় করেছে।

বাংলাদেশে জুলাইয়ের শুরু থেকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ভূমিধস ও বন্যায় অন্তত ১৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্য দিকে পাকিস্তান একই সঙ্গে খরা ও বন্যার দ্বৈত সংকটের মুখোমুখি। দেশটিতে সামগ্রিকভাবে গড় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও উত্তরের পার্বত্য এলাকায় হঠাৎ হিমবাহ গলে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।

ধানের ফলন কমে যেতে পারে অর্ধেক পর্যন্ত

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনো পুরোপুরি বিকশিত হলে দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ধানের ফলন এক-পঞ্চমাংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এসব অঞ্চলে ধান লাখ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। ফলে খাদ্যের ঘাটতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংক আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যখন ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং তেহরানের পাল্টা হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও সার সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে চলতি বছরে সার উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা কৃষি উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা দাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, দুর্যোগ আঘাত হানার জন্য অপেক্ষা না করে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আগাম প্রস্তুতির জন্য অর্থায়ন করতে হবে। সংস্থাগুলোর মতে, সময়মতো বিনিয়োগ করা গেলে সম্ভাব্য প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত