Ajker Patrika

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী স্থগিত

শিল্পী ও নির্মাতাদের ক্ষোভ, নীরব চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো, মানববন্ধনে রুমিন ফারহানা

বিনোদন প্রতিবেদক, ঢাকা
শিল্পী ও নির্মাতাদের ক্ষোভ, নীরব চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো, মানববন্ধনে রুমিন ফারহানা
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার পোস্টার

বাধার মুখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী স্থগিত করার পর থেকে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া। এমন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিল্পী ও নির্মাতারা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আয়োজিত মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তবে এ ঘটনায় নীরব রয়েছে চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো।

যেভাবে ঘটনার শুরু

ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার। ওই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনীর আয়োজন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। এমন ঘোষণার পর শহরের কওমি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে প্রচারণা চালায়। পরে সম্ভাব্য উত্তেজনার কথা বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসন প্রদর্শনী স্থগিত করে। পরে ওই দিন রাতে কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামে সিনেমাটি প্রদর্শনের উদ্যোগ নিলেও প্রশাসনের বাধায় তা সম্ভব হয়নি।

নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের ক্ষোভ

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার নির্মাতা তানিম নূর। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিচালক রেদওয়ান রনি, খন্দকার সুমন, আশফাক নিপুন, আদনান আল রাজীব; অভিনেত্রী রুনা খান, পিয়া জান্নাতুল প্রমুখ।

তানিম নূর বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্প্রতি বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনীতে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সব সময় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির উর্বর ভূমি। সুস্থ বিনোদন ও শিল্পের চর্চা কখনো আমাদের সমাজ কিংবা বিশ্বাসের ক্ষতি করে না, বরং মানসিক বিকাশ ঘটায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো নিষেধাজ্ঞার চেয়ে পারস্পরিক আলোচনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বেশি প্রয়োজন। আসুন, আমরা যেকোনো চরমপন্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি এবং আমাদের প্রিয় শহরের সুন্দর ভাবমূর্তি রক্ষায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন সন্তান হিসেবে এই ঘটনা আমাকে মর্মাহত করেছে।’

সোশ্যাল মিডিয়ায় রেদওয়ান রনি লেখেন, ‘শুধু বনলতা এক্সপ্রেস নয়, দেশের সব চলচ্চিত্রের জন‍্য এই ঘটনা চরম উদ্বেগজনক! এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে অদূর ভবিষ্যতে এটা চলচ্চিত্র উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হবে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তথ‍্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ব‍্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’

অভিনেত্রী রুনা খান লেখেন, ‘বাংলাদেশে নির্মিত যেকোনো চলচ্চিত্র যদি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড কর্তৃক ছাড়পত্র পায়, তবে তা দেশের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো সময় প্রদর্শন করার অধিকার রাখে। দর্শকও অধিকার রাখেন কোন সিনেমা দেখবেন বা কোনটা দেখবেন না! বনলতা এক্সপ্রেস কি সার্টিফিকেশন বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া সিনেমা নয়? ছাড়পত্র পাওয়া যেকোনো সিনেমা প্রদর্শনে বাধা দেবার কোনো আইনগত অধিকার কি কোনো ব্যক্তি-দর্শক-সংগঠন কারোরই আছে?’

মানববন্ধনে রুমিন ফারহানা

বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের শাহবাজপুর গ্রামে স্থানীয় জনগণের নামে একটি মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রতিবাদ জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। মানববন্ধনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখন কোনো সিনেমা হল নেই, কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। এই কালো মব কারা করছে? যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, দেশকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়, বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর কাছে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চায়, তারাই বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনীতে বাধা দিচ্ছে। এই সিনেমা আমি দেখেছি। পুরো পরিবার নিয়ে দেখার মতো সিনেমা বনলতা এক্সপ্রেস। সেটা কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো?’

রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘যে রাষ্ট্র ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও বলাৎকার থেকে রক্ষা করতে পারে না, যে রাষ্ট্র দুর্নীতি, টাকা পাচার ও ব্যাংক লুট বন্ধ করতে পারে না, সেই রাষ্ট্র কেন সিনেমা বন্ধে মদদ দেয়? গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে তুলে নিয়ে লাশ পোড়ানো হয়েছে। আমরা দেখেছি উগ্রবাদের উত্থান। কিন্তু আমার দেশ তো এমন ছিল না। এই দেশের মাটিতে আজানের মধুর ধ্বনি যেমন শোনা যায়, তেমনি বাউলের গানও শুনেছি। কারা এই বাংলাদেশকে মৌলবাদের ভূমি বানাতে চায়।’

নীরব চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে। শিল্পী ও নির্মাতারা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তবে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এখন পর্যন্ত একেবারে চুপ। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি, প্রদর্শক সমিতিসহ কোনো সংগঠন থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি আসেনি। সংগঠনগুলোর এমন নীরবতার সমালোচনাও করছেন অনেকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত