Ajker Patrika

ডিজিটাল যুগে সফল হতে কেন পড়াশোনা জরুরি

ডা. তানজিম আহমেদ অন্তর
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ০৮
ডিজিটাল যুগে সফল হতে কেন পড়াশোনা জরুরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ডিজিটাল জগতে বেড়ে উঠছে আজকের শিশু-কিশোর ও তরুণেরা। এদের বেশির ভাগই ফেসবুকের হোমপেজ এবং টিকটকের রিলসে ডুবে থাকছে। দেখছে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়াই ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেকের সফলতা। এতে তাদের মনে প্রশ্ন জাগছে—‘তারা যেহেতু পড়াশোনা ছাড়াই সফল হচ্ছে। তাহলে পড়াশোনা কি কোনো প্রয়োজন আছে?’প্রশ্নটি অমূলক নয়। বরং সময়ের বাস্তবতা থেকে এর জন্ম। তাই এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার নয়; বরং সময়োপযোগী, যুক্তিনির্ভর উত্তর তুলে ধরাই আমি দায়িত্ব বলে অনুভব করছি।

সমস্যা শিক্ষায় নয়, শিক্ষার ধরনে

শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, এটি থাকবে। মুখস্থনির্ভর পাঠ্যক্রম, দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের অভাব কিংবা কর্মজীবনের সঙ্গে শিক্ষার দূরত্ব—এসব বাস্তব সমস্যা। কিন্তু তাই বলে পড়াশোনার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, এমন ধারণা আত্মঘাতী। বরং এখনই সময় পড়াশোনাকে নতুনভাবে ভাবার। এমন শিক্ষা দরকার, যা ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত, জীবনঘনিষ্ঠ এবং দক্ষতানির্ভর।

পড়াশোনা মানে শুধু পরীক্ষা নয়

অনেকে মনে করেন, পড়াশোনার উদ্দেশ্য শুধু ভালো ফল করা বা একটি চাকরি পাওয়া। বাস্তবতা ভিন্ন। পড়াশোনা মানে নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন করে গড়ে তোলা। নতুন জ্ঞান গ্রহণ করা। যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখা। সমস্যা বিশ্লেষণ করা। দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে ওঠা। আজ যে তরুণ শেখার গুরুত্ব বোঝে না, আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় সে টিকে থাকাও কঠিন হবে।

কনটেন্ট ক্রিয়েটরেরও জ্ঞান দরকার

অনেকে ভাবতে পারে, ইউটিউবার, টিকটকার কিংবা ইনফ্লুয়েন্সার হতে আবার পড়াশোনার কী দরকার? কিন্তু সফল কনটেন্ট তৈরি করতে হলে জানতে হয় মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা ও প্রযুক্তিকে। উদ্যোক্তা হতে হলে বুঝতে হয় অর্থনীতি, বাজার ও মানুষের চাহিদা। ফ্রিল্যান্সার হতে হলেও প্রতিনিয়ত নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ পেশা বদলাতে পারে, কিন্তু শেখার প্রয়োজন কখনো বদলায় না।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীই দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। তাদের যদি মানসম্মত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতায় গড়ে তোলা যায়, তবে ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি থাকলে এই জনসংখ্যাগত সুযোগই একসময় বড় বোঝায় পরিণত হবে।

পড়াশোনাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের হার অশিক্ষিত তরুণদের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। এই পরিসংখ্যান একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—পড়াশোনা এখনো সবচেয়ে বড় পুঁজি। সময়ের সঙ্গে যার মূল্য কমে না; বরং বাড়তে থাকে। বিখ্যাত মার্কিন দার্শনিক ও বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন ‘ অ্যান ইনভেস্টমেন্ট ইন নলেজ পেজ দ্য বেস্ট ইন্টারেস্ট।’ অর্থাৎ, জ্ঞানে বিনিয়োগই সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।

শিক্ষা থেমে গেলে ভবিষ্যৎও থেমে যায়

কোভিড-১৯ মহামারির সময় দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকার প্রভাব আজও বিশ্ব বহন করছে। ইউনেস্কো ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই শিক্ষা-ব্যাহত প্রজন্ম সম্মিলিতভাবে প্রায় ২১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের আজীবন আয়ের ক্ষতির মুখে পড়েছে। যা বিশ্বের বর্তমান মোট জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশের সমান। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব নয়; এটি একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা হারানোর তথ্য। শিক্ষা থেমে গেলে উন্নয়ন থেমে যায়। জ্ঞানের বিনিয়োগ কমে গেলে একটি জাতির ভবিষ্যৎও সংকুচিত হয়ে আসে।

শেখার সুযোগ আরও বিস্তৃত

এখনকার পৃথিবীতে শেখার জন্য শ্রেণিকক্ষই একমাত্র মাধ্যম নয়। ঢাকা, রাজশাহী কিংবা সিলেটের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও একজন শিক্ষার্থী হার্ভার্ড বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার দেখতে পারে। অনলাইন কোর্স করতে পারে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টিউটরের কাছ থেকেও শিখতে পারে। শিখো, ১০ মিনিট স্কুল, কোরসেরা কিংবা খান একাডেমির মতো প্ল্যাটফর্ম শেখাকে এনে দিয়েছে হাতের মুঠোয়। তাই প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সবচেয়ে বড় সহযোগী।

শেখার ক্ষমতাই ভবিষ্যতের মূলধন

আজকের পৃথিবীতে একটি ডিগ্রির চেয়েও মূল্যবান হয়ে উঠছে শেখার ক্ষমতা। যে মানুষ প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে পারে, নিজেকে বদলাতে পারে, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে—সাফল্য শেষ পর্যন্ত তার দিকেই আসে। একজন ইউটিউবার, উদ্যোক্তা, গবেষক কিংবা ফ্রিল্যান্সার—সবার সফলতার ভিত একই। সেই ভিতের নাম শেখার মানসিকতা।

আর এই মানসিকতার জন্ম হয় শিক্ষার মধ্য দিয়েই। ডিজিটাল যুগে শিক্ষার ধরন বদলেছে, কিন্তু শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা একটুও কমেনি। আজ বই শুধু তথ্য দেয় না; শেখার পথও দেখায়। প্রযুক্তি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি জ্ঞানের দরজাও খুলে দেয়। তাই পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নয়, বরং নতুনভাবে পড়াশোনার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে হবে।

ডা. তানজিম আহমেদ অন্তর, এমবিবিএস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত