Ajker Patrika

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের প্রভাব: শিক্ষার্থী সংকট হবে উচ্চশিক্ষায়

রাহুল শর্মা, ঢাকা
এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের প্রভাব: শিক্ষার্থী সংকট হবে উচ্চশিক্ষায়
ফাইল ছবি

চলতি বছর উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের কারণে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ আসনই ফাঁকা থাকবে। এতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অধিকাংশ কলেজ ও জোড়াতালি দিয়ে চলা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভয়াবহ শিক্ষার্থী সংকটে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র বলছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ভর্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার তুলনামূলক কম হবে। কারণ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ আসনসংখ্যা রয়েছে তার তুলনায় জিপিএ-৫ পেয়েছে কমসংখ্যক শিক্ষার্থী।

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত শনিবার। এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের গড় হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।

উচ্চশিক্ষা দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ মিলিয়ে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে মোট আসনসংখ্যা ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসন রয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার। এই হিসাব অনুযায়ী এবার উত্তীর্ণ হওয়া সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক পর্যায়ে আসন ফাঁকা থাকবে ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৩টি।

চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ শিক্ষার্থী। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। তাঁদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা রেকর্ডসংখ্যক কমেছে। এর মধ্যে পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ শিক্ষার্থী।

ফল বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, এবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ আসন রয়েছে তার চেয়ে কমসংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এতে এবারের ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে তুলনামূলক কম। তবে কয়েকটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আগের মতোই।

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে আসনের কোনো স্বল্পতা নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গত শনিবার সচিবালয়ে এইচএসসির ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এইচএসসি ও সমমানে পাস করা সব শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পরেও অনেক আসন ফাঁকা থাকবে।

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তরপত্র যথাযথ মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, আইসিটি ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষায় খারাপ ফল এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ফল বিপর্যয় হয়েছে। ২০০৪ সালের পর এই প্রথম এইচএসসিতে পাসের হার এত কম। ওই বছর পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। পরের বছর ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ০৭ শতাংশ। মূলত ২০০৫ সাল থেকে পাসের হার বাড়তে শুরু করে।

ইউজিসির তথ্যমতে, ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসনসংখ্যা ৬৩ হাজার ৬৫৬টি, সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন রয়েছে ৫ হাজার ১০০টি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৬ হাজার ২৭৮টি, সরকারি ডেন্টাল কলেজে ৫৪৫টি, বেসরকারি ডেন্টালে ১ হাজার ৩৫০টি, আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে ৩৫০টি, ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক কোর্সে ৪ লাখ ১০ হাজার, পাস কোর্সে ১ হাজার ১৬০টি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক (পাস), স্নাতক (সম্মান), স্নাতক কারিগরি/সমমান পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি কলেজে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫টি, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ১১ হাজার ৫৫টি, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২ হাজার ৪৩৪টি, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ৭২০টি, টেক্সটাইল কলেজে ৭২০টি, মেরিন কলেজে ৬৬০টি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে ৩ হাজার ৭৯০টি, আন্তর্জাতিক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০০টি, নার্সিং ও মিডওয়াইফারিতে ৫ হাজার ৬০০টি আসন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। এবার এসব প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে ৬০ হাজার। এর বাইরে কিছু শিক্ষার্থী ‘নামকরা’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত বিষয়ে পড়তে ভর্তি হন।

ধারণা করা হচ্ছে, এবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত গুটিকয়েক কলেজ ছাড়া কেউই শিক্ষার্থী পাবে না। সংকটে পড়বে জোড়াতালি দিয়ে চলা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও।

জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমানুল্লাহ ফেরদৌস বলেন, এ বছর এইচএসসিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর চেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা বেশি। ফলে আমাদের কয়েক লাখ আসন খালি থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমরা বিকল্প পথ খুঁজছি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কারিগরি বিষয়ে নতুন কোর্স চালু করে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদেরও কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় আনা যায় কি না, সে বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান অধ্যাপক আমানুল্লাহ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত