Ajker Patrika

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়: নামেই ইনস্টিটিউট, প্রশ্ন মানে

  • জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রফেশনাল কলেজ ও ইনস্টিটিউট ৩২১টি
  • কোর্স রয়েছে মোট ৩৫টি বিষয়ে, বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার
  • অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আধুনিক ল্যাব সুবিধা
রাহুল শর্মা, ঢাকা 
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়: নামেই ইনস্টিটিউট, প্রশ্ন মানে
ছবি: সংগৃহীত

ময়মনসিংহ মহানগরের পণ্ডিতপাড়া। সেখানকার একটি বহুতল ভবনে সাইনবোর্ড ঝুলছে ব্রিটিশ বাংলা ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির। এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সাইনবোর্ডের লেখা অনুযায়ী সেখানে তিনটি বিষয়ে চার বছর মেয়াদি কোর্স পড়ানো হয়। তবে ২৩ জুন সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম দেখা যায়নি। প্রতিষ্ঠানটিরও কোনো কার্যক্রম বা ব্যক্তিকে দেখা যায়নি।

সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত যে ৩২১টি প্রফেশনাল কলেজ ও ইনস্টিটিউট রয়েছে এটি সেগুলোর একটি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৩৫টি বিষয়ে বিভিন্ন মেয়াদি কোর্স রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত করলেও অধিকাংশের মান নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান উচ্চ কোর্স ফি নিলেও যথাযথ শিক্ষা দিচ্ছে না।

শিক্ষাবিদদের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেক প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট শুধু সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মান নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা ও ব্যবহারিক শিক্ষার দিকে যথেষ্ট নজর না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ বা ল্যাব সুবিধাও নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সনদ পেলেও চাকরির বাজারে সুবিধা করতে পারছেন না। সংখ্যা বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের।

এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের পাওয়া তথ্যের অনেকগুলোই হতাশাজনক। শিক্ষার নামে যারা ব্যবসা করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ২ হাজার ২৮৩টি কলেজে পড়ছেন প্রায় ৩২ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৩২১টি প্রফেশনাল কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ৩৫টি বিষয়ে প্রফেশনাল কোর্স রয়েছে। এসব কোর্সে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্র জানায়, প্রফেশনাল কলেজ ও ইনস্টিটিউটের মধ্যে সারা দেশে আইন কলেজ রয়েছে ৭৪টি। বিএড কলেজ রয়েছে ৯২টি। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড বিবিএ ইনস্টিটিউট রয়েছে ৬২টি। বিপিএড (শারীরিক শিক্ষা) কলেজ রয়েছে ২৫টি, লাইব্রেরি সায়েন্স কলেজ ৩০টি, বিএসএড (বিশেষ শিশু শিক্ষা) কলেজ ৮টি, আর্ট কলেজ ৭টি এবং সংগীত কলেজ ২টি, ফটোগ্রাফি কলেজ একটি, স্পোর্টস কলেজ বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এবং রাজশাহীতে একটি হোম ইকোনমিকস কলেজ রয়েছে। গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং কোর্স রয়েছে ১৪টি কলেজে। এ ছাড়া সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য রয়েছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), মেরিন ফিশারিজ ইনস্টিটিউট, পুলিশ স্টাফ কলেজ এবং ফায়ার রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট।

ময়মনসিংহ নগরের পণ্ডিতপাড়ার বহুতল ভবনে ঝোলানো সাইনবোর্ড অনুযায়ী, ব্রিটিশ বাংলা ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) এবং লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স (ডিপ্লোমা) কোর্স পড়ানো হয়। তবে ২৩ জুন দুপুরে গিয়ে ভবনটির কোথাও এই প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক পাওয়া যায়নি, কার্যক্রমও দেখা যায়নি। ভবনে থাকা উদ্দীপন কোচিং সেন্টারের পরিচালক আশিকুর রহমান বলেন, ব্রিটিশ বাংলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাঝেমধ্যে আসেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কীভাবে চলে তা তিনি জানেন না।

একই দিন ওই ভবনের কাছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত স্টেট ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্সে (সিবাকস) গিয়ে দেখা যায়, ক্লাসে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী, কম্পিউটার একটি। তাঁদের একজন নিজের ল্যাপটপ নিয়ে এসেছেন। সিএসই কোর্সের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী নাসরিন আক্তার আজকের পত্রিকাকে বলেন, এখানে শিক্ষার্থী কম, পড়াশোনাও কম হয়। অন্য জায়গায় সিএসই-তে পড়ার সুযোগ না থাকায় ভর্তি হয়েছেন। শিক্ষকদের আন্তরিকতায় টিকে আছেন।

সিবাকসের প্রভাষক আদনান আল নওশাদ বলেন, কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীরা বেতন, ফি ঠিকমতো দেন না। গত সেশনে ২৩ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও চার-পাঁচজন চলে গেছেন।

বরিশালে অবস্থিত বরিশাল ইনফরমেশন টেকনোলজি কলেজে চার বছর মেয়াদি বিবিএ ও সিএসই কোর্স রয়েছে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রফেশনাল তৈরির এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষক রয়েছেন আটজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্লাসে শিক্ষার্থী উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়; অনেকে অনিয়মিত। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোর্স ফি অনেক বেশি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অধিকাংশ প্রফেশনাল কলেজ ও ইনস্টিটিউটের চিত্রই কম-বেশি এমন। রাজধানী ঢাকার বাইরের অনেক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা নাজুক। বিশেষ করে কম্পিউটার সায়েন্স ও বিবিএভিত্তিক বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটগুলোর অনেকগুলোতেই শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার্থী সংকট, আধুনিক ল্যাবের অভাব এবং অনিয়মিত পাঠদানের মতো সমস্যা প্রকট। তবে রাজধানীর প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা তুলনামূলক ভালো।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, অধিভুক্ত প্রফেশনাল কলেজ ও ইনস্টিটিউটগুলোতে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মনিটরিং শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সিলেবাস আধুনিকায়ন, কোর্স ফি নির্দিষ্ট কাঠামোতে আনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ ২৩ জুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রফেশনাল ইনস্টিটিউটগুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে কার্যকর কোনো পর্যালোচনা হয়নি। আমরা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি। যে তথ্যগুলো পেয়েছি, তার অনেকগুলোই হতাশাজনক।’ তিনি বলেন, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে। শিক্ষার নামে যারা ব্যবসা করছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্র জানায়, সারা দেশে অধিভুক্ত ৭৪টি আইন কলেজের মধ্যে ঢাকা বিভাগেই রয়েছে ৩৫টি। বরিশালে চারটি, রংপুরে ছয়টি, রাজশাহীতে ছয়টি, খুলনায় আটটি, চট্টগ্রামে ১২টি এবং সিলেটে তিনটি আইন কলেজ রয়েছে। ৯২টি বিএড কলেজের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৬টি, খুলনায় ১৮, চট্টগ্রামে ১৩, বরিশাল ও রংপুরে সাতটি করে, রাজশাহীতে আট এবং সিলেটে তিনটি রয়েছে।

অধিভুক্ত ৬২টি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড বিবিএ ইনস্টিটিউটের মধ্যে ঢাকায় ৩২টি, ময়মনসিংহে ছয়, রাজশাহীতে ছয়, খুলনায় সাত, চট্টগ্রামে ছয়, বরিশাল ও রংপুরে দুটি করে এবং সিলেটে একটি রয়েছে। গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং কোর্সের ১৪টি কলেজের মধ্যে ঢাকায় ১০টি, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে একটি করে রয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট ও কলেজের শিক্ষার মানের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ মনজুর আহমদ বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ ইনস্টিটিউট নামেই। কারণ, এগুলোতে যে মানে গবেষণা, পাঠদান করার কথা, তা হচ্ছে না। এদিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক তাহমিনা আকতার বলেন, প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠাই করা হয় দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য সামনে রেখে। যদি পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকে, তাহলে এই শিক্ষা কোনো কাজে আসবে না।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন আজকের পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল ও খুলনা এবং ময়মনসিংহ প্রতিনিধি।)

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত