
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে এ বছর। শিক্ষা বোর্ডগুলোর গড় পাসের হার, ফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫; দুটিই এবার কমেছে। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি। শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে এবং বেড়েছে সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবিক বিভাগের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া, ইংরেজি ও গণিতে কম পাসের হার এবং মাদ্রাসা বোর্ডের দাখিলে পাসের হার কমে যাওয়ায় এবারের সামগ্রিক ফল খারাপ হওয়ায় বড় ভূমিকা রেখেছে। এর সঙ্গে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষার হলে এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘কড়াকড়ি’ও পাসের হার কমে যাওয়ায় প্রভাব ফেলেছে।
সার্বিক ফলাফলের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, মানবিক বিভাগে এবার ফল খারাপ হয়েছে। ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের পাসের হার কম হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে।
দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি বছরের এসএসসি এবং সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ১১ শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গতবারের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জনের।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৭ সালের পর চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার সবচেয়ে কম। ২০০৭ সালে গড় পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২১ সালে দেশে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছিল।
এবারের সার্বিক ফলাফল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে এটাও প্রকৃত মূল্যায়ন নয়। প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষা ও শিক্ষাদর্শন। এগুলোর কোনোটি এখনো আমাদের হয়নি। মূল্যায়নকেন্দ্রিক পরীক্ষা থেকে আমাদের বের হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ইংরেজি ও গণিতে খারাপ ফল করার অন্যতম কারণ দক্ষ শিক্ষকের অভাব। আমাদের এদিকে নজর দিতে হবে।’
চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে মানবিক বিভাগে। এই বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিক বিভাগের প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ জনের বেশি পাস করতে পারেনি। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে গড় পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও মানবিক বিভাগের ধসের চিত্র স্পষ্ট। ঢাকা বোর্ডে এই বিভাগে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, রাজশাহী বোর্ডে ৪৬ দশমিক ৭৯, কুমিল্লা বোর্ডে ৫০ দশমিক ৬১, যশোর বোর্ডে ৫৫ দশমিক ৫৭, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৩৮ দশমিক ৭৯, বরিশাল বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৩৪, সিলেট বোর্ডে ৪৮ দশমিক ১৬, দিনাজপুর বোর্ডে ৩৮ দশমিক ৭৫ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াস আহমেদ বলেন, ‘কেন ফল খারাপ হয়েছে, তা পর্যালোচনা না করে এখনই বলা সম্ভব নয়। আমরা আগে ফলাফল পর্যালোচনা করব। মোটামুটি এবার সব শিক্ষা বোর্ডেই ফল কিছুটা খারাপ হয়েছে।’
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজি ও গণিতের ফলাফল এবার সামগ্রিক পাসের হারে বড় প্রভাব ফেলেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ইংরেজিতে মাত্র চারটি বোর্ডে পাসের হার ৭৫ শতাংশের বেশি। এগুলো হলো ঢাকা বোর্ড, কুমিল্লা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
বাকি বোর্ডগুলোর মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যশোরে ৭১ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রামে ৭২ দশমিক ২৭, বরিশালে ৬৯ দশমিক ২৪, সিলেটে ৬৯ দশমিক ১১, দিনাজপুরে ৭২ দশমিক ৯১ এবং ময়মনসিংহে ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
গণিতেও একই চিত্র। পাঁচটি বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৬৯ দশমিক ৬১, মাদ্রাসা বোর্ডে ৬৯ দশমিক ৯৭ এবং কারিগরি বোর্ডে ৭০ দশমিক ৯১ শতাংশ। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর ও সিলেট শিক্ষা বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৭৫ শতাংশের বেশি।
বরাবর তুলনামূলক ভালো ফল করা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলেও এবার ধস নেমেছে। এ বছর দাখিল পরীক্ষায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও পাস করেছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭৯ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সর্বনিম্ন।
গত বছর দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাৎ এবার পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত বছর দাখিলে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯ হাজার ৬৬ জন। এবার পেয়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৫০ জন।
জানতে চাইলে মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এবার পরীক্ষার হলে এবং খাতা বা উত্তরপত্র মূল্যায়নে আগের বছরের তুলনায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। এ ছাড়া কয়েক বছর পর এবারই প্রথম পূর্ণ সিলেবাস এবং পূর্ণ নম্বরে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা হয়েছে। এবারই প্রথম সব পরীক্ষার কেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছিল। কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ছিল ‘বডি ওর্ন’ ক্যামেরা। ফলে শিক্ষার্থীরা অসদুপায় অবলম্বনের এবং নকল করার তেমন সুযোগ পায়নি। এর প্রভাবও পড়েছে ফলাফলে।
জানতে চাইলে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী বলেন, ‘ইংরেজি ও গণিতের কারণে ফল খারাপ হয়েছে। সে কারণে পাসের হার কমেছে। সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। ফল কিছুটা খারাপের এটাও কারণ।’
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বক্তব্যেও খাতা মূল্যায়নে হাত খুলে নম্বর না দেওয়ার বিষয়টি এসেছে। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘চাইলেই পাবলিক পরীক্ষার খাতায় মন খুলে নম্বর দেওয়া যায় না। খাতায় যা লিখেছে শিক্ষার্থীরা, সেই অনুযায়ী নম্বর পেয়েছে।’

চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। সর্বশেষ ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এবার অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী।
২ ঘণ্টা আগে
রংপুরের পীরগঞ্জের চতড়া ইউনিয়নের কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয়। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ৫৪ জনের মধ্যে ২৯ জন পাস করেছিল এখান থেকে। এক বছরের ব্যবধানে সেই বিদ্যালয়ের ১৮ পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। অথচ বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৯ জন শিক্ষক ও ৬ জন কর্মচারী রয়েছেন।
২ ঘণ্টা আগে
আজ সোমবার সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের সংবাদ সম্মেলনে আজকের পত্রিকার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, ‘আজ এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না, শুধু এসএসসির ফল নিয়ে প্রশ্ন করুন।’
৪ ঘণ্টা আগে
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার তিনটি দাখিল মাদ্রাসা থেকে চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ শিক্ষার্থীর কেউই পাস করেনি। ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলে গোঁবরচাপাহাট আখতার হামিদ, জোলাপাড়া ইসলামিয়া ও খাদাইল দাখিল মাদ্রাসার পাসের হার শূন্য দেখা গেছে।
৭ ঘণ্টা আগে