শিক্ষার্থীদের অনাস্থা, উদয়ন স্কুলের তদন্ত কমিটি থেকে সরে দাঁড়ালেন ঢাবির দুই সহকারী প্রক্টর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর। তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনাস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এদিকে নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের দিন বিকেলে তদন্ত কমিটি থেকে সরে দাঁড়ান তারা। কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. এনামুল হক সজীব জানান, তদন্ত প্রতিবেদন প্রায় প্রস্তুত ছিল। তবে শিক্ষার্থীরা কমিটির ওপর অনাস্থা জানানোয় তারা প্রতিবেদন জমা না দিয়ে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ড. এনামুল হক সজীব বলেন, ‘পূজার ছুটির প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। প্রাথমিকভাবে দুই পক্ষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার উদ্যোগ নিই। তবে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী আরও পাঁচজনের নাম উল্লেখ করছেন। এভাবে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং পুরো বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে কিছুটা সময় লেগে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেদন প্রায় প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। চাইলে গতকাল মঙ্গলবার আমরা প্রতিবেদন জমা দিতে পারতাম। কিন্তু এর আগেই গত সোমবার শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষ বরাবর লিখিতভাবে জানায়, তদন্ত কমিটির ওপর তাদের আস্থা নেই। শিক্ষার্থীদের যেখানে তদন্ত কমিটির ওপরই আস্থা নেই, সেখানে কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের ওপরও তাদের আস্থা থাকার কথা নয়। এমন পরিস্থিতিতে আমি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর এক সহকারী প্রক্টর তদন্ত কমিটি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। গতকাল বিকেলে আমাদের অব্যাহতিপত্র অধ্যক্ষ বরাবর পৌঁছে দিয়েছি।’

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বলেন, ‘আমাদের তদন্ত কমিটির কাজ ৯৯ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা যেহেতু কমিটির প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে, সে কারণে আমরা প্রতিবেদন জমা দিতে পারছি না। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মিলেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।’
এদিকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে বলে গত সোমবার তাঁকে জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় তাদের বলেছি, যেকোনো সমস্যা তোমরা আমাকে জানাবে। তোমরা আমার সন্তানের মতো, আমি বিষয়টি দেখব।’
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন হওয়া সত্ত্বেও একই অনুষদের দুই শিক্ষককে তদন্ত কমিটিতে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, ‘বিষয়টি সত্যিকার অর্থে আমার মাথায় ছিল না যে তাঁরা কোন অনুষদের শিক্ষক। বরং ইতিবাচক দিক বিবেচনা করেই তাঁদের কমিটিতে রেখেছিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, বিদ্যালয়ের ভেতরের শিক্ষকেরা যেন তদন্তে পক্ষপাতিত্ব করতে না পারেন, সে কারণে বাইরের শিক্ষকদের রাখা হয়েছিল।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ওই দুই সহকারী প্রক্টর তদন্ত কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাই নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। নতুন কমিটির নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য অনুষদের শিক্ষকদের রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীর ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আপত্তিকরভাবে বিকৃত করা, অশালীন বার্তা পাঠানো ও শারীরিকভাবে হয়রানির অভিযোগ ওঠে একই শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরক্ত করে আসছিল এবং সম্প্রতি আপত্তিকর ছবি তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও প্রতিকার পায়নি তারা। গত ৭ অক্টোবর অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন সহকারী প্রক্টর বিদ্যালয়ে যান। পরদিন ১০ শিক্ষার্থীকে আলাদা কক্ষে নিয়ে লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। এ সময় তাদের দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা এবং অভিযোগের পক্ষে ডিজিটাল প্রমাণ থাকা একটি মুঠোফোন নিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করে শিক্ষার্থীরা।
প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রথমে তাদের ক্লাস ও পরীক্ষা থেকে বিরত রাখা হয়। পরে অভিভাবকদের প্রতিবাদের মুখে আলাদা কক্ষে পরীক্ষার ব্যবস্থা হলেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সুযোগ দেওয়া হয়নি। পূজার ছুটিসহ ২৫ দিনের বেশি সময় ধরে তারা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে ছাড়পত্র দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।









