Ajker Patrika

কার্বন ফুটপ্রিন্ট মানে কি বিড়ালের পায়ের ছাপ?

কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব 
কার্বন ফুটপ্রিন্ট মানে কি বিড়ালের পায়ের ছাপ?
অঙ্কন: লেখক

জৈব রসায়নের মূল নায়ক কার্বন পণ করেছিল, সে আর কোনো শিক্ষার্থীকে ভয় দেখাবে না; বরং ছোট্ট বিড়াল হয়ে গল্পের ছলে শেখাবে। অনেক দিন পর সেই কার্বন ভাইয়ার ডাকে সোজা চলে গেছে কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব!

কার্বন ভাইয়া, এত দিন পর হঠাৎ ডাক?

আর বোলো না! তোমরা ফেসবুকে বিড়ালের রিল দেখো ঠিকই, আমার খোঁজখবর নাও না। ওদিকে সারা দুনিয়া আমার পায়ের ছাপ নিয়ে মহাচিন্তায়। ইংরেজিতে একে বলে কার্বন ফুটপ্রিন্ট।

পায়ের ছাপ? কাদা মেখে কারও ঘরের সর্বনাশ করেছেন নাকি?

নারে বাপু, এই ছাপ চোখে দেখা যায় না। কয়লা, তেল বা গ্যাস পোড়ালে আমি দুই পা দিয়ে এক অক্সিজেন বন্ধুর দুই হাত, বাকি দুই পা দিয়ে আরেক অক্সিজেন বন্ধুর দুই হাত ধরি। তখন আমরা কার্বন ডাই-অক্সাইড (মিথেন (CH₄) হয়ে উড়াল দিই আকাশে। তোমার ফ্যান চালানোর বিদ্যুৎ উৎপাদন, গাড়িতে চড়া, এমনকি তোমার জামা বানানো—সব কাজে কিছু কার্বন বিড়াল কার্বন ডাই-অক্সাইড হয়ে বায়ুমণ্ডলে পাড়ি জমায়। কোনো মানুষ, পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের কারণে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বাতাসে যত গ্রিনহাউস গ্যাস মেশে, সব কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য হিসাবে ধরে যে যোগফল পাওয়া যায়, সেটাই তার কার্বন ফুটপ্রিন্ট।

বাতাসে মিশলে সমস্যা কী?

সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডল ভেদ করে মাটিতে পৌঁছায়; আমরা বাধা দিই না। মাটি আর সাগর সেই আলো শোষণ করে গরম হয়ে তাপ ছাড়ে অবলোহিত (ইনফ্রারেড) রশ্মি হিসেবে। সেই রশ্মি আমরা বিকিরণ করে আবার ভূপৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিই। তাই তাপ সহজে মহাশূন্যে পালাতে পারে না। একেই বলে গ্রিনহাউস প্রভাব। এটি অনেকটা গায়ে লেপ দিয়ে রাখার মতো। আমরা, অর্থাৎ তাপ ধরে রাখা গ্যাসেরা না থাকলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা হতো প্রায় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ সব জমে বরফ হয়ে যেত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড যত বাড়ে, লেপ তত মোটা হয়। গ্রীষ্মের দুপুরে মোটা লেপ গায়ে দিলে কেমন লাগবে বলো তো? পৃথিবীরও এখন একই দশা।

যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা এনওএএ-এর হিসাবে, শিল্পবিপ্লবের আগে বাতাসের প্রতি ১০ লাখ কণার মধ্যে ২৮০টি ছিল কার্বন ডাই-অক্সাইড; এখন তা ৪২৫ ছাড়িয়েছে। নিশ্চয় টের পাচ্ছ যে গরম বাড়ছে, খবরে দেখতে পাচ্ছ বরফ গলে সাগরের পানি বাড়ছে, নিচু এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে।

তাহলে কি গরম করার কাজটা শুধু আপনার?

নারে, দলটা অনেক বড়। বাতাসের প্রায় ৯৯ ভাগই নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন, অথচ ওরা অবলোহিত রশ্মি শোষণ করতে পারে না বলে তাপও ধরে রাখতে পারে না। যেসব গ্যাস পৃথিবীর ছেড়ে দেওয়া অবলোহিত রশ্মি শুষে নিয়ে আবার বিকিরণ করে, তাদেরকে বলে গ্রিনহাউস গ্যাস। আমার পরিবারের সবাই সেই দলের। চার পায়ে হাইড্রোজেন স্যান্ডেল পরলে আমি হই মিথেন (CH₄)। ধানখেত, গরুর পেট আর ভাগাড় মিথেনের উৎস। আইপিসিসির হিসাবে, এক কেজি মিথেন ১০০ বছরে পৃথিবীকে যতটা গরম করে, ততটা করতে লাগে প্রায় ৩০ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড! সারের নাইট্রাস অক্সাইডকে (N₂O) বলে লাফিং গ্যাস। কারণ, এটি হাসির উদ্রেক ঘটায়। কিন্তু পরিবেশে তার প্রভাব হাসির নয়। এর এক কেজি ২৭৩ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য!

লক্ষ করেছ, প্রতিবারই হিসাবটা কার্বন ডাই-অক্সাইডে বদলে নিচ্ছি? এই নিয়মের কারণ হলো, সকল গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কোনো গ্যাসের এক কেজি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত ১০০ বছরে) যত তাপ আটকায়, ততটা আটকাতে যত কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড লাগত, সেটি ওই গ্যাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য বা CO₂e। বিদ্যুতের সুইচগিয়ারের এসএফ-সিক্সের (SF₆) এক কেজি এই হিসাবে প্রায় ২৫ হাজার ২০০ কেজি, অর্থাৎ ২৫.২ টন CO₂e!

তাহলে আমরা কী করতে পারি?

দেখো বাপু, ছাপ একেবারে মুছে ফেলা যায় না, কিন্তু কমানো যায়। ঘর থেকে বেরোনোর সময় ফ্যান-লাইট বন্ধ করো, এসি কম চালাও, কাছের পথে হাঁটো, লিফট কম ব্যবহার করো। খাবার নষ্ট কোরো না; প্রতিটি ভাতের চাল উৎপাদনের জন্যও শক্তি খরচ হয়। পলিথিনের বদলে কাপড়ের ব্যাগ নাও। সুযোগ থাকলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করো। আর গাছ লাগাও। গাছ আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। সালোকসংশ্লেষণে সে আমাকে আকাশ থেকে নামিয়ে এনে নিজের খাবারে যত্ন করে রেখে দেয়, আর বিনিময়ে তোমাদের অক্সিজেন দেয়।

চমৎকার বললেন। তার মানে ছোট কাজে বড় পরিবর্তন।

একদম তাই। পৃথিবী বাঁচানোর শুরুটা হতে পারে একটা সুইচ বন্ধ করা থেকে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে শিল্প পর্যায়ের সবাই মিলে সচেতনভাবে চললে কমানো সম্ভব কার্বন ফুটপ্রিন্ট। অনেক কথা হলো। এখন কার্বন ডাই-অক্সাইড হয়ে উড়াল দেব আকাশে। আজ তবে আসি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত