Ajker Patrika

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

খুলনার ‘নিয়ন্ত্রণ’ সাত সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে

  • গত চার দিনে তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটে।
  • নগরীর ৩০২ বস্তিতে দুজন করে প্রশিক্ষিত শুটার।
  • বেশ কিছু এলাকায় চরমপন্থীদের তৎপরতা রয়েছে।
  • সন্ত্রাস দমনে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান নাগরিক সমাজের।
কাজী শামিম আহমেদ, খুলনা
খুলনার ‘নিয়ন্ত্রণ’ সাত সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে
প্রতীকী ছবি

গত চার দিনে খুলনায় তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে খুলনা মহানগরীতে দুটি এবং জেলায় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এলাকার আধিপত্য বিস্তার, মাদক বেচাকেনা, চাঁদাবাজি ও চরমপন্থী সম্পৃক্ততায় এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এসবের পেছনে রয়েছে সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনী। তারাই খুলনার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে।

গত দেড় বছরে খুলনা নগরীতে একাধিক সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান, মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত খুনোখুনি হচ্ছে। এ সময়ে ৬০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে, এমন দাবি সাধারণ মানুষের।

এদিকে খুলনার প্রতিটি বস্তিতে একাধিক অস্ত্রধারীর অবাধ বিচরণ থাকায় প্রশাসন উদ্বিগ্ন। পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্যমতে, মহানগরীর ৩০২টি বস্তিতে দুজন করে প্রশিক্ষিত শুটার রয়েছে। এ ছাড়া এসব বস্তিতে গড়ে চারজন করে নারী মাদক বিক্রেতা রয়েছে। যারা খুবই ভয়ানক।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য আফিল গেট এলাকার পেট্রলপাম্প-সংলগ্ন একটি গ্যারেজে অবস্থান করছিলেন ঘের ব্যবসায়ী সোহেল শেখ। বেলা ৩টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে এসে দুই যুবকের একজন তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করে। একটি গুলি তাঁর মাথায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এ ঘটনায় মামলা করা হলেও হত্যার কোনো ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি।

এ ঘটনার এক দিন পর দিঘলিয়া উপজেলার পথের বাজারে ইজারার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের নেতা মুরাদ খান।

এদিকে খুলনার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবু ও পলাশ গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। তাদের দ্বন্দ্বের কারণে খুলনায় অনেক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সর্বশেষ গত রোববার রাত ৯টার দিকে নগরীর নিরালা মোড়সংলগ্ন জাহিদুর রহমান ক্রস রোডে ওই দুই বাহিনীর বিরোধের জেরে আব্দুল আজিজ নামের এক যুবক খুন হন। তিনি পলাশ বাহিনীর হয়ে কাজ করতেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খুলনা নগরীতে কিশোর গ্যাং নিয়ে গড়ে ওঠে রোহান ও পলাশ গ্রুপ। পরে এই দুই গ্রুপ ভেঙে গিয়ে তিনটি বাহিনীতে রূপ নেয়। পলাশ, গ্রেনেড বাবু এবং নুর আজিম আলাদা বাহিনী গঠন করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থী হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ওরফে আরমিন ও নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের আলাদা বাহিনী রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, নাসিম শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে জেলহাজতে থাকায় এই বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। গত ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে নাসিম এবং অন্য বাহিনীর প্রধান আরমান খুলনার নতুন কারাগার থেকে মুক্তি পান। ফলে খুলনায় এখন সাতটি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।

এ ছাড়া ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, তালাসহ বেশ কিছু এলাকায় চরমপন্থীদের তৎপরতা রয়েছে। উপকূলের কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা এলাকায় বনদস্যুদের ব্যাপক দাপট রয়েছে। এসব অপরাধী রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝেমধ্যে কিছু সন্ত্রাসী অস্ত্রসহ আটক হলেও তা খুবই সামান্য।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত ম রোকনুজ্জামান বলেন, ‘খুলনার প্রতিটি বস্তিতে কমপক্ষে দুজন করে শুটার রয়েছে। তারা এক স্থানে থাকে না। তারা ভাড়াটে হিসেবে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে বেআইনি কাজ করে থাকে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করা খুবই কঠিন।’

এদিকে খুলনায় পরপর তিন খুন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খুলনার নাগরিক সমাজ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

খুলনার নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ। গড়ে প্রতিদিন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাদক বিক্রেতাদের দৌরাত্ম্যে খুলনাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নিরাপত্তা দাবি করেছিলাম। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। সন্ত্রাস দমনে নতুন সরকারকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী মোমিনুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাস দমনের এখনই উপযুক্ত সময়। সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে না পারলে খুলনা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রশাসনের সভায় এমপির বউ, ইউএনও-এসি ল্যান্ড বদলি

কিশোরগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার স্ত্রীর লাশ উদ্ধার

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা না বাড়াতে উপসাগরীয় মিত্রদের সৌদির ‘গোপন বার্তা’

মার্কিন বাহিনীতে আক্রমণের কোনো পরিকল্পনা ছিল না ইরানের: কংগ্রেসকে পেন্টাগন

ভুলবশত ৩টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে কুয়েত: মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত