Ajker Patrika

ব্রিটিশ আমলে গঠিত সীমান্তরক্ষী বাহিনী পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা শুভেন্দুর

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ব্রিটিশ আমলে গঠিত সীমান্তরক্ষী বাহিনী পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা শুভেন্দুর
ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস–ইএফআর একদল সদস্যের শপথ অনুষ্ঠান। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এক ঘোষণা ঘিরে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস (ইএফআর)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এটি সাধারণ শাখায় পরিণত হয়েছিল। শুভেন্দু অধিকারী ব্রিটিশ ভারতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে গঠিত এই বাহিনী আবারও পৃথকভাবে গঠন করার ঘোষণা দিয়েছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, মূলত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বাহিনী গঠন করেছিল। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনী ১৯২০ সাল থেকে বর্তমান নাম ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস বা ইএফআর নামে পরিচিত।

পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াংয়ে এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেখানে উপস্থিত তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসে (ইএফআর) ১ হাজার চাকরি দেওয়া হবে। ভারতীয় জনতা পার্টির ডাবল ইঞ্জিন সরকার নিশ্চিত করবে, সব সরকারি চাকরিতে আমাদের মেয়ে ও বোনেরা ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ পাবেন।’

দার্জিলিংয়ের এমপি রাজু বিস্তা বলেন, ‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুজি ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের জন্য এক হাজারের বেশি গোর্খা যুবক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন, এজন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। গত বহু বছর ধরে আমি ইএফআর পুনরুজ্জীবিত করার জন্য কাজ করেছি, কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বারবার সেই প্রস্তাব আটকে দিয়েছে। শুভেন্দুজি আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, বিজেপি সরকার গঠিত হলেই আমরা ইএফআরকে ফিরিয়ে আনব। আজ কার্শিয়াং থেকে তিনি সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন।’

বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বাহিনীর শিকড়ও এই ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসের সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে বাহিনীটি ইএফআর নামে পরিচিত, বাংলাদেশের বর্তমান বিজিবিও তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ।

ভারত বিভাগের সময় বাহিনীটিও দুই ভাগে বিভক্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তান অংশের নাম হয় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেটির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) করা হয় এবং ২০১০ সালে আবার নাম বদলে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীনতার পর থেকে বাহিনীটি ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস নামই ধরে রেখেছে।

পশ্চিমবঙ্গে নকশালবিরোধী অভিযানে ইএফআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এই লড়াইয়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের সিলদা এলাকায় ইএফআরের একটি ক্যাম্পে নকশাল হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ওই হামলায় ইএফআরের ২৪ সদস্য নিহত হন।

ইএফআরের মূলমন্ত্র হলো ‘ওয়াফাদারি অউর বাহাদুরি’ অর্থাৎ ‘বিশ্বস্ততা ও সাহসিকতা।’ আগের রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনটি ব্যাটালিয়ন একীভূত করে বর্তমানে বাহিনীতে দুইটি ব্যাটালিয়ন রাখা হয়েছে। এই বাহিনী প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। পাশাপাশি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তাদের সম্পৃক্ততা ছিল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, ঐতিহাসিক ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসকে শিগগিরই পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং এতে এক হাজারের বেশি গোর্খা যুবককে নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি দেশের প্রতিরক্ষায় গোর্খা সেনাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন আগের রাজ্য সরকার ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসে নিয়োগ কার্যত স্থগিত রেখেছিল। তাঁর দাবি, একসময় ঐতিহাসিক মর্যাদাসম্পন্ন এই বাহিনীকে আগের সরকার সংকুচিত করে মাত্র দুইটি ব্যাটালিয়নে নামিয়ে এনেছিল।

বিজেপির অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের আগের সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই বাহিনীকে দুর্বল করে দিচ্ছিল এবং কার্যত ‘বাহিনীটিকে মেরে ফেলার’ পথে হাঁটছিল। দলটি ইএফআরকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতিও দেয়। দার্জিলিংয়ের বিজেপি এমপি রাজু বিস্তা আরও বলেন, ‘ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস আমাদের দেশের সেবায় অসাধারণ সম্মান ও গৌরবের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের গৌরবময় ইতিহাসের মধ্যে রয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ, ভারত-চীন যুদ্ধ, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশভাগের সময় থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহ দমন, মাওবাদী অভিযান মোকাবিলা, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতেও ইএফআর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রেখেছে।’

রাজু বিস্তা বলেন, ‘তবে গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার এমন একটি ঐতিহ্যবাহী বাহিনীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০১০ সালের পর থেকে একবারও নতুন নিয়োগ হয়নি, অথচ ২ হাজারের বেশি রাইফেলম্যানের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এই ঐতিহাসিক বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিনটি ব্যাটালিয়নকে একীভূত করে দুইটিতে নামিয়ে এনেছে। এর ফলে সদস্যদের মনোবল ও বাহিনীর কার্যকারিতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত