Ajker Patrika

আদ-দ্বীন হাসপাতালে আতঙ্ক, রোগী সরিয়ে নিচ্ছেন স্বজনেরা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৭ মে ২০২৬, ১৮: ৫৯
আদ-দ্বীন হাসপাতালে আতঙ্ক, রোগী সরিয়ে নিচ্ছেন স্বজনেরা
৬ নবজাতকের মৃত্যুর পর অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঢাকার মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আজ বুধবার দুপুরের পর থেকে চিকিৎসাধীন প্রসূতি ও তুলনামূলক সুস্থ নবজাতকদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের।

স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও অপর্যাপ্ত পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার কারণেই একসঙ্গে এতগুলো শিশুর প্রাণ গেছে। এই পরিস্থিতিতে সেখানে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন তাঁরা।

আজ সকালে ঘটনার খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকে হাসপাতাল চত্বরে থমথমে ও শোকার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দুপুরের পর অনেক স্বজনকেই তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেখা যায়।

কল্যাণপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে সন্তান প্রসব করাতে আসা রেজাউল করিম জানান, সকালে কন্যাসন্তানের বাবা হওয়ার আনন্দের মধ্যেই তিনি একের পর এক নবজাতকের মৃত্যুর খবর পান। চরম মানসিক চাপে পড়ে বিকেলেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

রেজাউল করিম বলেন, ‘হাসপাতালে থাকার মতো ঝুঁকি নিতে আর ইচ্ছে করল না। যেখানে চোখের সামনে এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো, সেখানে নিজের সন্তানকে রাখা নিরাপদ মনে করিনি।’

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

একইভাবে কেরানীগঞ্জ থেকে আসা মোসাদেক নামের এক রোগীর স্বজন জানান, তাঁরা প্রসবের জন্য ভর্তি করানোর উদ্দেশ্যে হাসপাতালে এসেছিলেন, কিন্তু ভেতরের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ও চারদিকের কান্নাকাটি দেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন এবং অন্য হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন।

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে আজ রোগী ভর্তি, স্বাভাবিক প্রসব ও সিজারিয়ান অপারেশনের সংখ্যা অন্য দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

আদ-দ্বীন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আশরাফুল ইসলাম ছয় নবজাতকের মৃত্যুর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। মৃত শিশুদের মায়েদের মধ্যে রয়েছেন নাজমা (যাঁর যমজ সন্তান মারা গেছে), মীম, ফারিয়া ও জান্নাত। এ ছাড়া হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তির নবজাতক সন্তানও মারা গেছে।

মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা বৃদ্ধ মাসুকাকে দেখা যায় তাঁর তিন দিন বয়সী মৃত নাতনিকে কোলে নিয়ে নির্বাক বসে থাকতে। পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন তাঁর পুত্রবধূ মীম। মাসুকা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভালো চিকিৎসার আশায় এত দূর থেকে আসছিলাম। টাকার কথা ভাবি নাই। কিন্তু তারা এই সর্বনাশটা কীভাবে করল?’

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

এদিকে হাসপাতালের দায়িত্বরত নার্স চন্দনা জানিয়েছেন, একই ওয়ার্ডের আরও দুই থেকে তিন নবজাতকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের দ্রুত পাঁচতলার এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।

তবে একাধিক রোগীর স্বজন দাবি করেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা প্রশাসনের দেওয়া হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে। তাঁদের অভিযোগ, অনেক পরিবার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ না জেনেই তড়িঘড়ি করে নবজাতকের মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ছয় নবজাতকের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করতে পেরেছি। মৃত্যুর প্রকৃত ও বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধানের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে এবং প্রয়োজনীয় আলামত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে।’

অন্যদিকে, আদ-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাহিদ ইয়াসমিন নিশ্চিত করেছেন, ঘটনাটি পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ঘটেছে। তবে কী কারণে অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে একসঙ্গে এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেনি।

উল্লেখ্য, আদ-দ্বীন হাসপাতাল একটি অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন’-এর মালিকানাধীন। এই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হলেন সেখ মহিউদ্দিন। তিনি আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সেখ আকিজ উদ্দিনের বড় ছেলে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত