Ajker Patrika

নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই—ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ১৪: ৩৩
নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই—ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
প্রতীকী ছবি

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার আগে দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।’ তিনি বলেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলাটি শুধু একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা।’

ট্রাইব্যুনাল বলেন, এই মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন বিচারক।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হলে তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। দেশের প্রতিটি আদালতকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাইব্যুনাল বলেন, শিশুদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ-সংক্রান্ত প্রতিটি মামলার পেছনে থাকে একটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা এবং একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। সেই প্রেক্ষাপটে শিশুটির মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।

আদালত সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘তদন্তকারী সংস্থা স্বল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে প্রসিকিউশন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সামনে হাজির করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা ও পেশাদারত্ব প্রশংসার দাবিদার বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।’

রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, শিশুটির মামলার মতো দ্রুত, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত অন্যান্য মামলায়ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার যেন অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে একই ধরনের নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার প্রত্যাশা করেন বিচারক।

ট্রাইব্যুনাল বলেন, একটি ন্যায়সংগত বিচার শুধু আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষী এবং বিচারব্যবস্থার সব অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচারের লক্ষ্য অর্জিত হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য প্রতিটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রায়ে আরও বলা হয়, ‘আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের নীতিমালার আলোকে সত্য উদ্‌ঘাটন করা। সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন, মামলার কাগজপত্র এবং সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতা, সংবেদনশীলতা ও বিচারিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে পর্যালোচনা করেই এ রায় দেওয়া হয়েছে।’

মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১৯ মে পল্লবীতে সোহেল-স্বপ্নার বাসায় প্রতিবেশীর শিশুকন্যা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ২০ মে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন। ঘটনার চার দিনের মাথায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বিচার শুরু হওয়ার পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত