গাজীপুর-জয়দেবপুরের শহরতলি থেকে শুরু হওয়া আবুল নুরুজ্জামানের যাত্রা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনার পর বৃত্তি নিয়ে তিনি জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর আমেরিকান বহুজাতিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এএমডি) এবং সাইপ্রেস সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাডেইয়া’র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড. মশিউর রহমান।
আপনার ক্যারিয়ার শুরুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি কী ছিল?
আমি শুধু ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ভালো সুযোগ খুঁজতে শিখেছিলাম। ইন্টারমিডিয়েটের পরই বুঝেছিলাম, বিদেশে পড়াশোনা করতে হলে তথ্য নিজে খুঁজে বের করতে হবে। তখন ইন্টারনেট ছিল না। আমি ঢাকায় ৩০ থেকে ৩৫টি দূতাবাসে গিয়ে স্কলারশিপের খোঁজ নিয়েছি। অনেক বাধা ছিল, হরতাল ছিল, সময় ছিল না, তবুও থামিনি। শেষে জাপানের মনবুশো স্কলারশিপ পেলাম; কারণ, ইলেকট্রনিকসে জাপান তখন খুব এগিয়ে। এ সিদ্ধান্ত আমাকে শেখায়, সুযোগ ‘ডাকে’ না, সুযোগ ‘খুঁজতে’ হয়। আর ক্যারিয়ারের শুরুতে এই অভ্যাসটাই পরের সব ধাপ সহজ করে দেয়।
প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে আপনি কী শিখেছিলেন?
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ২০০৪ সালে এএমডিতে যখন যোগ দিই, তখন বুঝি করপোরেট দুনিয়ায় শুধু ভালো কাজই যথেষ্ট নয়, কাজের প্রভাব বোঝানোও জরুরি। নতুন হিসেবে আমি শিখেছি, কোম্পানি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। কোন কাজগুলো ব্যবসার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন কাজগুলো শুধু ব্যস্ত রাখে। আমি তখন থেকে চেষ্টা করেছি, প্রোডাক্ট আর রেভিনিউর কাছাকাছি কাজ করতে—যেখানে ফল দেখা যায়। আপনার কাজ যদি কোম্পানির লক্ষ্যকে এগোয়, সেটা চোখে পড়বেই। তাই প্রথম চাকরিতে আমার বড় শিক্ষা হলো কাজ বাছাই করতে হবে, আর কাজের ফল মাপতে হবে।
আপনি কীভাবে স্কিল ডেভেলপ করতেন?
আমি স্কিলকে দুই ভাগে দেখি। একটা হলো হার্ড স্কিল আর সফট স্কিল। হার্ড স্কিল হলো টেকনিক্যাল বোঝাপড়া। প্রোডাক্ট, মার্কেট এসব। সফট স্কিল হলো কমিউনিকেশন, টিমওয়ার্ক, প্রেজেন্টেশন, নেগোশিয়েশন। আমি ইচ্ছা করে বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করেছি। কারণ, নতুন ডোমেইন মানে নতুন শেখা। টি-ই কানেকটিভিটিতে টাচ সেন্সর, ল্যাটিসে প্রোডাক্ট ডেফিনেশন, সাইপ্রেসে প্রসেস ও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স—প্রতিটি জায়গায় আলাদা আলাদা শেখা। আপনি যদি ছাত্র হন, তাহলে এখন থেকেই প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ, ক্লাব, ভলান্টিয়ারিং—এসবের মাধ্যমে ‘কাজ দেখানো’ অভ্যাস করুন। ডিগ্রি আপনাকে ইন্টারভিউ পর্যন্ত নেবে, দক্ষতা আপনাকে এগিয়ে রাখবে।
করপোরেট দুনিয়ায় প্রফেশনালিজম বলতে কী বোঝেন?
আমার কাছে প্রফেশনালিজম মানে তিনটি জিনিস: দায়িত্ব নেওয়া, সময়ের মূল্য বোঝা এবং বিশ্বাসযোগ্য থাকা। দায়িত্ব নেওয়া মানে শুধু নিজের কাজ নয়, সমস্যা দেখলে সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া। সময়ের মূল্য মানে মিটিং, ডেডলাইন, কমিটমেন্ট—এসব ঠিক রাখা। আর বিশ্বাসযোগ্যতা আসে যখন মানুষ দেখে আপনি কথা ও কাজ মিলিয়ে করেন। করপোরেটে অনেকে অভিযোগ করে ‘ওরা ঠিক করছে না’। আমি বলি, অভিযোগ কম করুন। সমাধানের প্রস্তাব দিন। যে সমস্যাকে আপনি সুযোগ হিসেবে দেখবেন, সে সমস্যাই একসময় আপনার ক্যারিয়ার গ্রোথের কারণ হবে।
আপনি কীভাবে নেতৃত্বে উঠলেন, লিডারশিপের মূল পাঠ কী?
লিডারশিপের মূল পাঠ হলো ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ হওয়া এবং ‘মানুষকে সঙ্গে নেওয়া’। প্রো-অ্যাকটিভ মানে কেউ বলার আগেই বুঝে নেওয়া। ভবিষ্যতে কী লাগবে, সেটা আন্দাজ করা এবং উদ্যোগ নেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো করপোরেট কোনো একক খেলা নয়; এটি টিমের খেলা। বিভিন্ন ফাংশনাল টিমকে একসঙ্গে কাজ করাতে না পারলে বড় ফল আসে না। যখন ঊর্ধ্বতনরা দেখেন আপনি সমস্যা ধরতে পারেন, সমাধান এগিয়ে নিতে পারেন, আর মানুষকে একসঙ্গে রাখতে পারেন—তখন দায়িত্ব বাড়ে। পদবি পরে আসে, আগে আসে দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা।
আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জাপানে ভাষা ও নতুন পরিবেশ। শুরুতে কঠিন লেগেছে। পরিচিত পরিবেশ নেই, বন্ধুবান্ধব নেই, ভাষা বাধা। কিন্তু সে চ্যালেঞ্জটাই আমাকে মানসিকভাবে শক্তশালী করেছে। এরপর আমেরিকায় এসে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। বাংলাদেশ, জাপান, আমেরিকা—প্রতিটি জায়গায় মানুষের ভাবনার ধরন আলাদা। আন্তর্জাতিক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে আপনাকে ভিন্নমতকে বোঝা শিখতে হবে। আপনি যদি শুধু নিজের কমফোর্ট জোনে থাকেন, এতে দৃষ্টি প্রসারিত হবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ পরামর্শ হলো, বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করুন। অনলাইন প্রজেক্ট, ওপেন সোর্স, ইন্টারন্যাশনাল টিম—এই অভ্যাস গড়ে তুলুন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই একজন শিক্ষার্থীর কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু পরীক্ষার জন্য পড়া। পরীক্ষার ফল দরকার, কিন্তু ক্যারিয়ারের জন্য দরকার কাজের প্রমাণ। আমি বলব, তিনটি জিনিস করুন।
এক: একটি স্কিল স্ট্যাক বানান। যেমন ডেটা, সফটওয়্যার, ডিজাইন, সেলস, মার্কেটিং। যেটাই হোক, একটা শক্ত ভিত্তি করুন।
দুই: কমিউনিকেশন। লিখতে শিখুন, প্রেজেন্ট করতে শিখুন, পরিষ্কারভাবে কথা বলতে শিখুন।
তিন: ইন্টার্নশিপ বা প্রজেক্ট। যেখানে আপনি বাস্তবে কিছু ডেলিভার করবেন এবং সুযোগ খোঁজার অভ্যাস গড়ুন। স্কলারশিপ, ইন্টার্নশিপ, ফেলোশিপ। এসব আপনার কাছে নিজে থেকে আসবে না।
ভবিষ্যতের জব মার্কেটে কোন ট্রেন্ডগুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করেন?
প্রযুক্তিভিত্তিক কাজ আরও বাড়বে। কিন্তু শুধু টেকনিক্যাল লোক নয়, টেকনোলজি দিয়ে ‘ভ্যালু তৈরি’ করতে পারে এমন লোকের চাহিদা বাড়বে। প্রোডাক্ট থিংকিং, ডেটা-ড্রিভেন সিদ্ধান্ত, কাস্টমার নিড বোঝা—এসব দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি বড় ট্রেন্ড হলো লোকালাইজেশন। বাংলাদেশে অনেক গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম আছে। কিন্তু স্থানীয় প্রয়োজন না বুঝলে তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে। যাঁরা স্থানীয় সমস্যাকে বুঝে প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধান দিতে পারবেন, তাঁরা এগিয়ে থাকবেন।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আপনার সবচেয়ে বাস্তব পরামর্শ কী?
আমি তিনটি বাস্তব কথা বলব। এক: রিজেকশন বা প্রত্যাখ্যানকে ভয় পাবেন না। রিজেকশন মানে আপনার পথ শেষ নয়, আপনার পদ্ধতি বদলাতে হবে। আমিও অনেক জায়গায় রিজেক্ট হয়েছি। কিন্তু আমরা সেগুলো নিয়ে গল্প করি না। দুই: নিয়ম আছে মানেই চেষ্টা বন্ধ নয়। রোটারির স্কলারশিপ জাপানিদের জন্য ছিল। তবু আমি আবেদন করেছি, কারণ হারানোর কিছু ছিল না। তিন: নিজের সময়কে মূল্য দিন। সময় সবার জন্য ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু সবাই একই ফল পায় না। আপনি প্রতিদিন যদি ছোট ছোট অভ্যাস যেমন পড়াশোনা, স্কিল, কমিউনিকেশন—এগুলো ঠিক রাখেন, পাঁচ বছর পর আপনার ক্যারিয়ার নিজেই আপনার পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার বয়স ২২। সদ্য স্নাতক শেষ করেছেন। সমাবর্তনের মঞ্চ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা লিঙ্কডইনের ফিড—সবখানেই এক পরামর্শ ঘুরেফিরে আসে: নিজের প্যাশন অনুসরণ করুন, যা ভালোবাসেন, সেটাই করুন।
২ ঘণ্টা আগে
পাবলিক স্পিকিংয়ের কথা ভাবলেই অনেকের বুক ধড়ফড় করে, হাতের তালু ঘেমে যায়। কিন্তু সত্য হলো, এটি কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়; চর্চার মাধ্যমে শেখা যায়। সঠিক প্রস্তুতি ও কৌশল থাকলে আপনি ভয়কে জয় করে একজন আত্মবিশ্বাসী বক্তা হয়ে উঠতে পারেন। চলুন জেনে নিই, পাবলিক স্পিকিংয়ে দক্ষ হওয়ার ১০টি কার্যকর কৌশল
০৭ জানুয়ারি ২০২৬
বর্তমান যুগে জ্ঞান বিনিময়ের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো প্রেজেন্টেশন। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে করপোরেট দুনিয়া, প্রশাসনিক বৈঠক থেকে শুরু করে গবেষণা সম্মেলন—সব জায়গাতে একটি পরিষ্কার ও গোছানো প্রেজেন্টেশনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু শুধু স্লাইড তৈরি করলেই একটি প্রভাবশালী প্রেজেন্টেশন হয় না।
১০ মে ২০২৫
বিজেএস পরীক্ষার জন্য একটি সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন। অনার্স ও মাস্টার্সে যে বিষয়গুলো বিজেএসের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো আগে শেষ করতে হবে। প্রথম দিকে প্রস্তুতি এলোমেলো মনে হতে পারে। কোথা থেকে শুরু করবেন, বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। তাই মূল প্রস্তুতি শুরু করুন আইন বিষয় দিয়ে।
১০ মে ২০২৫