Ajker Patrika

চুরি করা ক্রিপ্টো যেন হাতে নেওয়া গরম আলু—বলছেন কুখ্যাত হ্যাকার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চুরি করা ক্রিপ্টো যেন হাতে নেওয়া গরম আলু—বলছেন কুখ্যাত হ্যাকার
প্রতীকী ছবি

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলায় প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবারের এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়।

কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির পর হ্যাকাররা সেগুলো দিয়ে কী করে? অর্থই বা কীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে? এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেছেন একসময়কার কুখ্যাত হ্যাকার ইলিয়া লিখটেনস্টাইন।

২০২৩ সালে স্ত্রী হিদার মরগানের সঙ্গে ২০১৬ সালে ক্রিপ্টো বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বিটফিনেক্সে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হওয়া প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন লিখটেনস্টাইন। ২০২৪ সালে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আগাম মুক্তি পান তিনি। বর্তমানে নিজের পরিচয় বদলে সাইবার হামলা ঠেকাতে কাজ করছেন বলে দাবি করেছেন এই সাবেক হ্যাকার। তিনি এখন ‘হোয়াইট হ্যাট’ বা নৈতিক হ্যাকার হিসেবে কাজ করছেন।

বাইন্যান্সে হামলা এবং চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি পাচারের জটিলতা নিয়ে সম্প্রতি সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেন লিখটেনস্টাইন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোনো ক্রিপ্টো বিনিময় প্ল্যাটফর্মে ঢুকে অর্থ চুরি করার চেয়ে সেই অর্থ নিরাপদে পাচার করা অনেক কঠিন।

বাইন্যান্সে হামলার ধরন সম্পর্কে তাঁর ধারণা জানতে চাইলে লিখটেনস্টাইন বলেন, এ ঘটনা উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের প্রচলিত কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়। তাঁর মতে, হ্যাকাররা সাধারণত নিরাপত্তাব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটিকে লক্ষ্য করে। সরাসরি বাইন্যান্সের ওয়েবসাইটে হামলা না চালিয়ে তারা প্রতিষ্ঠানের কোনো দুর্বল কর্মীকে ফিশিংয়ের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলতে পারে। ওই কর্মীকে দিয়ে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ডাউনলোড করিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশের পথ তৈরি করা সম্ভব।

তাঁর ভাষায়, শুধু মূল প্রবেশপথ নিরাপদ রাখলেই হবে না; নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতিটি দরজা-জানালা সুরক্ষিত রাখতে হবে।

চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য প্রথম ৪৮ ঘণ্টাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। কারণ, এই সময়ের মধ্যে হ্যাকাররা চুরি করা অর্থ ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও ব্লকচেইনে ছড়িয়ে দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তায় এখন এসব কাজ অত্যন্ত দ্রুত করা সম্ভব। ফলে যত সময় যায়, অর্থের গতিপথ শনাক্ত করা তত কঠিন হয়ে পড়ে।

লিখটেনস্টাইন বলেন, ব্লকচেইনে লেনদেনের তথ্য প্রকাশ্য হওয়ায় চুরি করা বিটকয়েনের গতিবিধি অনুসরণ করা সম্ভব। এ জন্য উন্নত ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রযুক্তিও রয়েছে। এমনকি টেথারের মতো কিছু ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম সন্দেহজনক অর্থ জব্দ করতে পারে। অর্থাৎ এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি বিকেন্দ্রীভূত নয়।

তাই হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্য থাকে দ্রুত অর্থের গতিপথ আড়াল করা এবং কোনোভাবে সেটিকে বৈধ অর্থে রূপান্তর করা। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে অনেক বেশি।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে লিখটেনস্টাইন জানান, বিটফিনেক্স থেকে একপর্যায়ে এক লাখের বেশি বিটকয়েন চুরি করেছিলেন তিনি। সেগুলো পাচারের জন্য বিভিন্ন ক্রিপ্টো বিনিময় প্ল্যাটফর্মে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। কিছু অ্যাকাউন্টে নিজের পরিচয় ব্যবহার করেছেন, অন্যগুলোতে ব্যবহার করেছেন ভুয়া পরিচয় কিংবা অর্থ লেনদেনে সহায়তাকারীদের পরিচয়।

এরপর ছোট ছোট অঙ্কে অর্থ জমা দিয়ে সেগুলো অন্য ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করেন। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘চেইন হপিং’। অর্থাৎ একটি ব্লকচেইন থেকে অন্য ব্লকচেইনে ক্রিপ্টোকারেন্সি স্থানান্তর করে লেনদেনের সূত্র আড়াল করার চেষ্টা।

তবে এখন এ ধরনের অর্থ পাচারের কাজে এআই ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বিপুল পরিমাণ চুরি করা ক্রিপ্টো হাতে থাকার অনুভূতি কেমন—এমন প্রশ্নের জবাবে লিখটেনস্টাইন বলেন, বিষয়টি ভয়ংকর। তাঁর ভাষায়, চুরি করা অর্থ যেন ‘গরম আলু’। হাতে থাকলেও তা ব্যবহার করা যায় না, কারণ যে কোনো মুহূর্তে নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অপরাধ করে অর্থ উপার্জন কখনোই লাভজনক নয়। ব্লকচেইনে একবার কোনো লেনদেনের তথ্য যুক্ত হলে তা স্থায়ীভাবে থেকে যায়। ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বহু বছর আগের লেনদেনও শনাক্ত করা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত অপরাধীরা ধরা পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তার জন্য এআইকে বড় ধরনের হুমকি বলেও মনে করেন এই সাবেক হ্যাকার। তাঁর দাবি, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানের উন্নত এআই মডেল ইতিমধ্যে অত্যন্ত জটিল সাইবার হামলা চালাতে সক্ষম। তবে নিরাপত্তার কারণে এসব মডেলের ব্যবহার কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে চীনের মতো দেশ থেকে তৈরি উন্মুক্ত এআই মডেলগুলোও দ্রুত এগোচ্ছে। লিখটেনস্টাইনের ধারণা, কয়েক মাসের মধ্যে এসব মডেল বিশ্বের দক্ষতম হ্যাকারদের চেয়েও উন্নত সাইবার হামলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

তাঁর আশঙ্কা, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হ্যাকারদের হাতে থাকা এ প্রযুক্তি অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের হাতেও পৌঁছে যেতে পারে। এমনকি ঘরে বসে থাকা কোনো কিশোরও এআই ব্যবহার করে ভয়াবহ সাইবার হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। ফলে ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা নিয়ে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত