দুই বছর—দেশের অর্থনীতির গতিপথ বোঝার জন্য খুব দীর্ঘ সময় নয়। তবে এই সময়েই বোঝা যায়, অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, আর কোন সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল বহুমুখী চাপে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের তীব্র সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চরম অবনতি এবং ভঙ্গুর ব্যাংক খাত—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চেপে বসেছিল ভয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় ১৮ মাস পর দায়িত্ব আসে নির্বাচিত সরকারের হাতে। বর্তমান সরকারেরও পাঁচ মাস পার হয়েছে।
দুই বছরে অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি এসেছে, আবার কিছু মৌলিক দুর্বলতাও রয়ে গেছে। তাই অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র এখনো একমাত্রিক নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং, রাজস্ব, বিনিয়োগ ও সুশাসনে কার্যকর সংস্কারই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে বৈদেশিক খাতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ডলার সংকট, রিজার্ভের চাপ, এলসি খোলা কমে যাওয়া এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে শিল্প উৎপাদন থেকে বাজার—সবখানেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সেই চাপ এখন অনেকটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বেশি। ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে রপ্তানি আয়ও।
অর্থনীতির এই চিত্র মূল্যায়ন করতে গিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বৈদেশিক খাতে বেশ উন্নতি হয়েছে। তবে সামগ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এখনো অসম্পূর্ণ। তাঁর মতে, রেমিট্যান্স, রপ্তানি ও রিজার্ভে অগ্রগতি অর্থনীতিকে স্বস্তি দিলেও মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, কম বেসরকারি বিনিয়োগ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও ব্যাংক খাতের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য এসব ক্ষেত্রে সংস্কার একযোগে এগিয়ে নিতে হবে।
এই উন্নতির প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। দুই বছর আগে দেশের গ্রস রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তা বেড়ে ৩৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে রিজার্ভের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমেছে। তবে আইএমএফের মতে, রিজার্ভ এখনো নিরাপদ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপ এখনো রয়েছে।
বৈদেশিক খাতের এই অগ্রগতি এখনো পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুনে কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু দাম বাড়ার গতি কমলেও মূল্যস্তর এখনো উচ্চ। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেও গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ থাকতে পারে।
শেখ হাসিনার আমলে অর্থনীতির বড় দুশ্চিন্তা হয়ে উঠেছে ব্যাংকিং খাত। অভ্যুত্থানের পর সেই দুশ্চিন্তা কেটেছে। তবে কাঠামোগত দুর্বলতা এখনে কাটিয়ে ওঠা যায়নি। গত দুই বছরে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে। আগে যেখানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১২ শতাংশ বলা হতো, এখন তা ৩২ শতাংশ হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের সংকট এখনো কাটেনি। আইএমএফও তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে ব্যাংকিং খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে হবে না। সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি নীতির কার্যকারিতা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মতো কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও তিনি জোর দেন।
এদিকে বিনিয়োগের গতিও এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও উচ্চ সুদের কারণে গত কয়েক বছর বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ছিল কম। পরিস্থিতি বদলাতে সরকার ব্যবসা সহজীকরণ, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। চীনা ও জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। তবে ঘোষণার তুলনায় বাস্তব বিনিয়োগের গতি এখনো ধীর।
প্রবৃদ্ধির চিত্রেও কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ, যা পরের অর্থবছরে কমে ৩ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৯৬, ৩ দশমিক ০৩ ও ২ দশমিক ২২ শতাংশ। জুলাই-মার্চ সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
রাজস্ব খাতে আংশিক অগ্রগতি দেখা গেলেও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। গত দুই বছরে কর প্রশাসন সংস্কার, ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কম। ফলে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ ও প্রশাসনিক সংস্কারে আরও গতি না এলে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও শক্তিশালী হবে না।
সরকার অবশ্য অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আজকের পত্রিকাকে বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই ছিল প্রথম লক্ষ্য। এখন বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগে জোর দেওয়া হচ্ছে। তাঁর আশা, এসব উদ্যোগ আগামী কয়েক বছরে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলবে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণের অন্যতম প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯.৫০ ডলারে নেমে আসে। গত ১৩ জুলাইয়ের পর এই প্রথম ব্রেন্টের দাম ৮০ ডলারের নিচে নামল। পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে সর্বশেষ ৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০.৫০ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল।
৫ ঘণ্টা আগে
রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেছেন, মোবাইল অপারেটরেরা কখনোই অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে অবৈধ আন্তর্জাতিক কল) ব্যবহার করে না। মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ককে ভিওআইপিতে ব্যবহার করা হয়।
৭ ঘণ্টা আগে
ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার লিমিটেডের (ইউসিএল) চেয়ারম্যানসহ চার শীর্ষ নেতৃত্বে রদবদল এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের ৩২৮তম সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ।
৮ ঘণ্টা আগে