Ajker Patrika

পোশাকশ্রমিকদের ‘অদৃশ্য কর’: দাবদাহে টিকে থাকতে বাড়ছে দৈনন্দিন খরচ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
পোশাকশ্রমিকদের ‘অদৃশ্য কর’: দাবদাহে টিকে থাকতে বাড়ছে দৈনন্দিন খরচ
ছবি: সংগৃহীত

তীব্র দাবদাহের মধ্যে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজের শিফট চলাকালে নিজেকে সুস্থ রাখতে স্যালাইন, লেবু আর ডাবের পেছনে মাসে এক হাজার টাকারও বেশি খরচ করতে হয় ৩২ বছর বয়সী নাসরিন বেগমকে।

১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনের মধ্যে এই অতিরিক্ত ব্যয় তাঁর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেও, চাকরি টিকিয়ে রাখার তাগিদে এই খরচ করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় থাকে না।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল কোনাবাড়ীর এই কারখানাটিতে প্রায় ১ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। সে জায়গায় সিলিং ফ্যান ও এগজস্ট ফ্যান চালু থাকলেও কাজের ভেতরে দাবদাহ থেকে রেহাই পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। ফলে বারবার মুখে-হাত-পায়ে পানি ছিটিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে হয় নাসরিনকে।

বাংলাদেশে আনুমানিক ৪০ লাখ তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত কর্মী রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দাবদাহের ক্ষতিকর প্রভাব সামলাতে প্রতি মাসে নিজের সীমিত আয় থেকেই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

শ্রমিক অধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘পিপলস কারেজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর গবেষক আমীনা কিদওয়াই ২০২৬ সালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমিকদের ওপর এক প্রতিবেদনে বিষয়টিকে একটি ‘অদৃশ্য তাপ কর বা মাশুল’ (হিট ট্যাক্স) হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কাজের পরিবেশে তীব্র গরম সামলে টিকে থাকার লড়াইয়ে শ্রমিকদের অতিরিক্ত যে আর্থিক বোঝার মুখোমুখি হতে হয়, তা এক প্রকার অদৃশ্য করের মতোই।’

বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে—যা বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির (০.৮ থেকে ১ ডিগ্রি) চেয়ে কিছুটা বেশি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরে অনুভূত হওয়া তাপমাত্রা আরও ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়।

কিন্তু তা সত্ত্বেও শিল্পাঞ্চল কিংবা খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দাবদাহ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশে এখনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা তৈরি হয়নি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা নিয়মিতভাবে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে।

কারখানায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরেও রেহাই পান না শ্রমিকেরা। সারা দিনের উত্তপ্ত মাটি রাতের বেলাতেও তাপ ছড়াতে থাকে, আর তার সঙ্গে যোগ হয় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট। ফলে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শরীর রিচার্জ হওয়ার সুযোগ পায় না।

গাজীপুরে গত দুই দশকে (২০০০-২০) সবুজ এলাকা কমে ভবন ও অবকাঠামো বাড়ার কারণে ভূমির উপরিভাগের গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ দশমিক ০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে সরকার বিদ্যুতের দাম ১৬ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি করায় বাসা এবং কারখানায় ঘর ঠান্ডা রাখার খরচ আরও বেড়ে গেছে।

গরমের কারণে বিশেষ ঝুঁকিতে পড়ছেন নারী ও গর্ভবতী শ্রমিকেরা। জাতীয় স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, শীতল দিনের তুলনায় তীব্র গরমের দিনে জন্ম নেওয়া শিশুরা তাপজনিত খিঁচুনি, হিট স্ট্রোক বা মাথাব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১৪ শতাংশ বেশি থাকে।

নাসরিন জানান, ছোট সন্তানটি যখন তাঁর গর্ভে, তখন প্রচণ্ড গরমে কাজ করা অত্যন্ত কষ্টকর ছিল এবং একাধিকবার অর্ধদিবস ছুটি নিতে হয়েছিল। এর ফলে তাঁর প্রতিদিনের মজুরি থেকে প্রায় ১০০ টাকা কেটে নেওয়া হতো।

শুধু শ্রমিকেরাই নন, দাবদাহ সামলাতে কারখানা মালিকদেরও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। ‘অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউট’-এর ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কারখানাগুলোর মুনাফা ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, তিনি তাঁর কারখানায় অতিরিক্ত ফ্যান ও বায়ু চলাচলের সুবিধা বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি বিনা মূল্যে খাওয়ার পানি, খাওয়ার স্যালাইন এবং হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালনার ফলে কারখানার পরিচালনা ব্যয় ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এরপরেও খরচের বড় অংশটাই বহন করতে হচ্ছে শ্রমিকদের নিজেদের। মো. শফিকুল ইসলাম নামে আরেক পোশাকশ্রমিক জানান, গরমে শরীর সতেজ রাখতে তাঁকে আখের রস, ঠান্ডা পানীয়, স্যালাইন ও ওষুধ কিনতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার টাকা খরচ করতে হয়। অধিকাংশ কারখানায় নিয়মিত স্যালাইন না দেওয়ায় নিজেদেরই তা কিনতে হয়।

তীব্র দাবদাহের কারণে শ্রমিকদের ঘুমের ব্যাঘাত ও যাতায়াতের কষ্টে ক্লান্তি তৈরি হওয়ায় কারখানার সার্বিক উৎপাদনশীলতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারখানায় তিন দিন দেরিতে পৌঁছালে একদিনের হাজিরা কেটে নেওয়া হয় বলেও জানান শ্রমিকেরা।

এ পরিস্থিতিতে কারখানা মালিকেরা মনে করছেন, শিল্প খাতের স্থায়িত্ব ও শ্রমিকদের সুরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি ও সুনির্দিষ্ট নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: কুয়েত টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত