Ajker Patrika

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ১৯: ৫৬
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্য দেন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ব্যাংক খাতের নজিরবিহীন লুটপাট ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সাবেক বিতর্কিত শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের সহজ শর্তে পুনরায় ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ দিতে বর্তমান সরকারের আনা বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬ ’-এর বিতর্কিত ১৮ (ক) ধারাটি বাতিল করা হচ্ছে। নানা সমালোচনা ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার আপত্তির মুখে অবশেষে পিছু হটেছে সরকার।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই ঘোষণা দেন।

জাতীয় সংসদে বাজেট সমাপনী ও অর্থ বিল পাসের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬-এর ধারা ১৮ (ক) বিষয়ে বিভিন্ন অংশীজনের জোরালো মতামত ও উদ্বেগের ভিত্তিতে সরকার এই ধারাটি সম্পূর্ণ বিলোপ বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ব্যাংক খাতে অনিয়ম প্রতিরোধ ও সাধারণ আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন—যারা জনগণের সম্পদ ও ব্যাংকের টাকা দেদারসে লুট করেছে, তাদের কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের আমানতের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বদ্ধপরিকর থাকবে।

সম্প্রতি ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন’ পাসের সময় এই বিতর্কিত ১৮ (ক) ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল। এই ধারার মূল বিধান অনুযায়ী, রেজ্যুলেশন বা একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় যাওয়া সমস্যাগ্রস্ত ও দেউলিয়া প্রায় ব্যাংকের সাবেক শেয়ারধারীদের আবারও ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও সমস্ত দায়-দেনা নতুন করে গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করার একটি আইনি তৈরি হয়েছিল। শর্ত হিসেবে সেখানে শুধু সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অর্থ ফেরত, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আমানতকারী ও পাওনাদারদের দাবি নিষ্পত্তিসহ কয়েকটি আইনি অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু এই ধারাটি যুক্ত হওয়ার পরপরই জাতীয় সংসদের ভেতরে বিরোধী দল এবং বাইরে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারদের মধ্যে ক্ষোভ ও ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এই বিশেষ ধারাটির মাধ্যমে বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক লুটপাট করে পালিয়ে যাওয়া এবং একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে পেছনের দরজা দিয়ে আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফিরিয়ে আনার এক অভিনব পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার পথ খুলে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এই বিপজ্জনক ধারাটি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তীব্র আপত্তির কথাও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে উঠে আসে।

উল্লেখ্য, এই ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনের মাধ্যমে দেশের চরম সমস্যাগ্রস্ত ও তারল্য সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এই পাঁচ ব্যাংক হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ।

এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চার ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ কারণেও ১৮ (ক) ধারা নিয়ে বিতর্ক বাড়ে।

সংসদে বাজেট আলোচনায় এর আগে বিরোধী দল ও কয়েকজন সদস্য ব্যাংক খাতে দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, পাচার অর্থ ফেরানো এবং দুর্বল ব্যাংক বাঁচাতে সরকারি অর্থ ব্যবহারের প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ব্যাংক খাত উদ্ধার করতে গিয়ে যেন জনগণের টাকা দিয়ে লুটেরাদের পুনর্বাসন করা না হয়। বিতর্কিত ধারা বিলোপের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর বার্তা দিলেন।

পরিশেষে এই বিতর্কিত ধারা বিলোপের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর একটি বড় ও ইতিবাচক বার্তা দিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত