Ajker Patrika

এসঅ্যান্ডপির মূল্যায়ন: চার ঝুঁকিতে আটকে প্রবৃদ্ধি

  • দুর্বল ব্যাংক খাত, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, জ্বালানির অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকি।
  • ২০৩০-এর আগে অর্থনীতির গতি ফেরার আশা কম।
  • ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করল এসঅ্যান্ডপি।
  • এর আগে ফিচ রেটিংসও ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ করেছিল।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
এসঅ্যান্ডপির মূল্যায়ন: চার ঝুঁকিতে আটকে প্রবৃদ্ধি

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকি—এই চার কাঠামোগত দুর্বলতায় আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরগতিতে চলবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় সংস্থাটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস (আউটলুক) ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

গত সোমবার প্রকাশিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসঅ্যান্ডপি বলেছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও আর্থিক খাতের ভারসাম্যহীনতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের সীমিত রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা, উচ্চ সুদ ব্যয় এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্থনীতির ধাক্কা মোকাবিলার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক অবস্থানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এসঅ্যান্ডপির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখনো তুলনামূলক কম এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাও দুর্বল। সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ায় আর্থিক নীতি পরিচালনার ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়েছে। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও দেশের ঋণমানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

এসঅ্যান্ডপির মতে, বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে প্রবাসী আয়, তৈরি পোশাক রপ্তানির পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অব্যাহত সহায়তার ওপর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে সেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানির দুর্বলতা এবং উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে আগামী কয়েক বছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।

এসঅ্যান্ডপি সতর্ক করে বলেছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি একই আয়ের দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে কিংবা বৈদেশিক অবস্থানের বড় অবনতি হলে দেশের সার্বভৌম ঋণমান আরও কমানো হতে পারে। একই ঝুঁকি তৈরি হবে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে গেলে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে অথবা বৈদেশিক ঋণের চাপ বৃদ্ধি পেলে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। একই সময়ে খেলাপি ঋণের চাপ মোকাবিলায় ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠন চলছে, যা স্বল্প মেয়াদে আর্থিক খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও চাপে রয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য ব্যক্তিগত ভোগব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার পুনরুদ্ধারকে ধীর করতে পারে। তবে কম উৎপাদন ব্যয় ও পর্যাপ্ত শ্রমশক্তির কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছে এসঅ্যান্ডপি। যদিও বৈশ্বিক চাহিদার মিশ্র প্রবণতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রত্যাশিত গতি পায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত শুল্কহার এখনো নির্ধারিত হয়নি। ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮৫ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। ফলে শুল্ক-সংক্রান্ত এই অনিশ্চয়তা রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ রেটিংসও বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছিল। এসঅ্যান্ডপির মতে, বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করবে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তা এবং ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত