বাড়তি সময়ের বড় পরীক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
• বাড়তি তিন বছরে ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখাতে হবে বাংলাদেশকে
• সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের এবং জবাবদিহি জরুরি
• সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে বাড়াতে হবে
• উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য প্রস্তুতিও নিতে হবে

এলডিসি উত্তরণে তিন বছর সময় বাড়িয়েছে জাতিসংঘ। এই বাড়তি সময় বাংলাদেশের জন্য অর্থনীতির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ জন্য শুধু পরিকল্পনা করলেই চলবে না। সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কাজের অগ্রগতি ও দায়িত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে এই বাড়তি সময়ের সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে গতকাল রোববার ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন ও মিডিয়া সংলাপে এমন প্রতিক্রিয়া জানায় সিপিডি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে।
সংলাপে মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি ব্যতিক্রমী। তাই এই সুযোগ কাজে লাগাতে আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখাতে হবে। একই সময়ে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া অতিরিক্ত সময়টি সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে জানান ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে চিঠি লিখে বাড়তি সময় চেয়েছেন। ফলে আগামী তিন বছরে নির্ধারিত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরও পড়েছে। এটি আর শুধু আমলাতন্ত্র বা কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়।
ড. দেবপ্রিয়র মতে, আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। প্রথমত, এলডিসি উত্তরণের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সুদের হার কমানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। এসব লক্ষ্য আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে একটির অগ্রগতি অন্যটির কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চার খাতে সংস্কারের তাগিদ
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরবরাহব্যবস্থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি সংস্কার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেন ড. দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, এসব খাতে কার্যকর সংস্কার করা গেলে উৎপাদন খরচ কমবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন খাতের বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সংস্কারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, সংস্কার সম্পন্ন না হলে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পথ মসৃণ ও টেকসই হবে।
সংসদে নিতে হবে সংস্কার কর্মসূচি
সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন ড. দেবপ্রিয়। তাঁর প্রস্তাব, উত্তরণকালীন সংস্কার কর্মসূচি সংসদে আলোচনা করতে হবে। বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত আলোচ্যসূচিতে রাখতে হবে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি কারিগরি পর্যায়ে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের পরামর্শ দেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, কারণ এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। জ্বালানি, প্রযুক্তি, সড়ক, নৌপরিবহনসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশের জন্য একটি ড্যাশবোর্ড তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, কোন প্রতিশ্রুতির দায়িত্ব কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থার, কত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়নের কথা এবং কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে—এসব তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় ককাস গঠনের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১০ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে এ ককাস গঠনের বিষয়ে স্পিকারের দপ্তর থেকে নোটিশ জারি হয়েছে।
সুবিধা ছাড়ার প্রস্তুতিও জরুরি
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন যেসব বাণিজ্যিক ও আর্থিক সুবিধা পেয়েছে, সেগুলো থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি জানান, আগামী বাজেট থেকে কোন কোন খাতে এসব সুবিধা কমানো হবে এবং কোন খাতে নতুন করে সহায়তা বাড়ানো হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের অ্যাকশন প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ত্রিবার্ষিক বাজেটারি কাঠামো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। তা না হলে বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এ কাজে সরকার, সংসদ, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকে যুক্ত করতে হবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে যতটা পারদর্শিতা দেখিয়েছে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ততটা পারেনি। এবার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হওয়া চলবে না। আগামী তিন বছরে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনে গুরুত্ব
এলডিসি উত্তরণের বাড়তি সময়কে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির আরেক বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, নতুন সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে শ্রমঘন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর সংযোজন, সেবা খাত এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাই বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার চেষ্টা না করে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সেখানে কার্বন কর, শ্রম অধিকার, লিঙ্গসমতা ও পরিবেশগত মানদণ্ডের বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগোলে নতুন শর্তও আসবে। তার সক্ষমতা অর্জনের প্রস্তুতি এখনই শুরু করতে হবে।
স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ জরুরি
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগের গতি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। এই তিন বিষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িত। তাই এগুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের লক্ষ্য শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এমন প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষও উন্নয়নের সুফল পাবে। এ জন্য নতুন করে কর্মসূচি নেওয়ার চেয়ে সরকারের চলমান সংস্কারগুলো নির্ধারিত সময়ে ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। তাহলেই উত্তরণের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সংবাদ সম্মেলন ও মিডিয়া সংলাপে সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন।









