Ajker Patrika

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস

১৪ ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ, ৪৭৫ কোটি টাকা লোপাট

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকা 
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৪১
১৪ ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ, ৪৭৫ কোটি টাকা লোপাট

কাগজ-কলমে প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয় আছে। এসব কার্যালয়ের ঠিকানাও আছে। রয়েছে যৌথমূলধনি কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধনও। কিন্তু বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এমন ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে ২৩টি পৃথক ঋণ দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে ৪৭৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

কাগুজে এসব প্রতিষ্ঠানকে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঋণগুলো দিয়েছে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল)। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এই ঋণ জালিয়াতিতে দেশের আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারিতে আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদারসহ (পি কে হালদার) অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

দুদকের সূত্র বলেছে, অনুসন্ধান শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৪টি পৃথক মামলা করার সুপারিশ করা হবে।

অভিযোগ রয়েছে, পি কে হালদার ২০১৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নামে-বেনামে সেখান থেকে দেড় হাজার কোটির বেশি টাকা বের করে নেন। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

দুদকের সূত্র জানায়, নামসর্বস্ব ১৪ প্রতিষ্ঠানের নামে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ২৩টি ঋণের মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন কৌশলে ওই অর্থ আত্মসাৎ এবং পাচার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

ঋণ নিয়ে ৪৭৫ কোটি টাকা আত্মসাতের এই অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি টিম। জানতে চাইলে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ওই ১৪টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ২৩টি পৃথক ঋণের মাধ্যমে ৪৭৫ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান শেষে ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় পি কে হালদারসহ সংশ্লিষ্ট অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৪টি পৃথক মামলা করার সুপারিশ করা হবে।

দুদকের সূত্র বলছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে কাগুজে ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি এবং মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করা হয়। এসব নথি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির একশ্রেণির কর্মকর্তা ঋণ অনুমোদন করেন। পরে ঋণের অর্থ পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাৎ করা হয়।

যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া হয়েছে ঋণ দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই ২৩টি ঋণের মধ্যে রেপটাইলস ফার্মা লিমিটেডের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে যথাক্রমে ৩০ কোটি ও ২৭ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার ৬৯০ টাকা নেওয়া হয়েছে। নর্দান জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের নামে নেওয়া হয়েছে ২৯ কোটি ৬৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩৩ টাকা।

পি অ্যান্ড এল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ৪৯ কোটি ৭৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৮৩ টাকা, এমএসটি ফার্মা অ্যান্ড হেলথকেয়ার লিমিটেডের নামে ৫৬ কোটি ৪৪ লাখ ৯২৭ টাকা, ক্রসরোড করপোরেশন লিমিটেডের নামে তিনটি ঋণের মাধ্যমে যথাক্রমে ২২ কোটি, ২৭ কোটি ৫০ লাখ ৯০ হাজার ও ৯ কোটি টাকা এবং ডিজাইন অ্যান্ড সোর্স লিমিটেডের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে নেওয়া হয় যথাক্রমে ১০ কোটি ৪৫ লাখ ও ৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া পদ্মা ওয়েভিং লিমিটেডের নামে ৬৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, এমওএইচ ফ্যাশন লিমিটেডের নামে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, শাহাদাত ট্রেডার্সের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে ২৯ কোটি ৭৩ লাখ ও ৩০ কোটি টাকা, জেড এ অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

সুপিরিয়র টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে ৪২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, সিমটেক্স টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে যথাক্রমে ২৩ কোটি ৮১ লাখ ও ২৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, এম জে ট্রেডিংয়ের নামেও দুটি ঋণের মাধ্যমে ৩০ কোটি ও ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং সন্দীপ করপোরেশনের নামে দুটি ঋণের মাধ্যমে যথাক্রমে ২৭ কোটি ও ২৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

দুদক বলছে, সুদে-আসলে বর্তমানে এসব ঋণের মোট পরিমাণ ৪৭৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। দুদকের সূত্র জানায়, পি কে হালদার ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ এবং পাচারের অভিযোগে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। একটি দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলায় ২০২৩ সালে তাঁকে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার ঘটনা দেশের আর্থিক খাতের বড় ব্যর্থতা। অতীতে আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে দেশের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এর থেকে উত্তরণে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত