ঠাকুরগাঁওয়ের হাসপাতাল: শয্যা নেই, গাছতলায় দেওয়া হচ্ছে শিশুদের চিকিৎসা
• ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে গত বুধবার ভর্তি ছিল ২০৪ শিশু।
• ফাঁকা নেই ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা। বাধ্য হয়ে গাছতলায় চলছে শিশুদের চিকিৎসা।
• অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট রয়েছে হাসপাতালে।

হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গাছের নিচে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে স্যালাইন। আবার কোনো অভিভাবক অপেক্ষায় আছেন ওষুধের জন্য। এটি ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ঘটনা। জায়গা না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে রেখেই শিশুদের চিকিৎসা করাতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকেরা। সেখানে রীতিমতো বিছানা পেতে অবস্থান করছেন অনেকে।
হাসপাতালের ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে গত বুধবার ভর্তি ছিল ২০৪ শিশু। শয্যা ছাড়িয়ে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দাতেও রাখা হয় রোগীদের। এরপরও জায়গা না হওয়ায় কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গাছতলায় শিশুদের নিয়ে অবস্থান করছেন অভিভাবকেরা। অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অসহনীয় পরিবেশ। গরম, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হওয়ার অভিযোগও করছেন তাঁরা।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার বলেন, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
পঞ্চগড়ের বিউটি বেগম তাঁর ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। শিশুটি জন্ম থেকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। এবার টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। একটি বিছানায় দুই-তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। তাই বেশির ভাগ সময় নাতিকে বাইরে খোলা বাতাসে রাখতে হয়। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শুধু ভেতরে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিউটি বলেন, নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাওয়ার পানির সংকট রয়েছে। হোটেল থেকে পানি আনতে হয়।
বালিয়াডাঙ্গীর বড় পলাশবাড়ীর আবু বকর বলেন, জ্বরের কারণে তাঁর সন্তান দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। ওয়ার্ডে ফ্যান থাকলেও প্রচণ্ড গরমের কারণে শিশুটি কান্নাকাটি করে।
প্রায় একই অভিযোগ করেন, ভূল্লী উপজেলার রুমা। দুই বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে আছেন। শিশুটির ১০-১২ দিন জ্বর। রুমা বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে বিনা মূল্যে কোনো ওষুধ পাননি। হাসপাতালে আসার আগে ১ হাজার ৩০০ টাকার ওষুধ কিনেছিলেন। চিকিৎসকেরা সেগুলো বাদ দেওয়ার পর নতুন করে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশুর বাবা জানান, তাঁর ১৫ মাস বয়সী মেয়েকে সোমবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হাসপাতালে আনেন। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দুটি ক্যানুলা কিনে আনলেও একটি শিশুর জন্য ব্যবহারের পর আরেকটি ক্যানুলা এবং নতুন টেপ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের কাছে রেখে দেয় বলে তাঁর অভিযোগ। পরে টেপ চাইলে নেই বলে জানানো হয়। ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। শৌচাগার ও ওয়াশরুমের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, দুটি শৌচাগারে সমস্যা রয়েছে, বাকি চারটি চালু আছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আগামী এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না পাওয়া এবং ক্যানুলা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য সুইপারদেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ৪৫ শয্যার জায়গায় কখনো ২৫০ জনের মতো শিশু ভর্তি থাকে। শিশুদের সঙ্গে মা-বাবাও থাকেন। ফলে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।









