Ajker Patrika

ডিজেল ও বিদ্যুতের এই সংকটকালে সোলেমানের ‘সূর্য-সেচ’ই সমাধান

সদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও
ডিজেল ও বিদ্যুতের এই সংকটকালে সোলেমানের ‘সূর্য-সেচ’ই সমাধান
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী গ্রামের মাঠে স্থাপিত ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র। ইনসেটে সোলেমান আলী। ছবি: আজকের পত্রিকা

আকাশে সূর্যের তেজ বাড়লে সাধারণ মানুষের হাঁসফাঁস বাড়ে। কিন্তু ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী গ্রামের কৃষকদের মুখে তখন দেখা যায় স্বস্তির ঝিলিক। কারণ, সেই প্রখর সূর্যই এখন তাঁদের ফসলের খেতে সেচের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছে।

একদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আর অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কৃষকের সেচকাজ যখন থমকে যাওয়ার উপক্রম, তখনই অন্ধকারের বিপরীতে আলোর পথ দেখাচ্ছে এক অদম্য কারিগর সোলেমান আলীর উদ্ভাবিত ‘ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র’। তেলের ড্রাম নিয়ে মাইলের পর মাইল ছোটাছুটি কিংবা মাঝরাতে বিদ্যুতের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষার প্রহর গোনার দিন ফুরিয়েছে এই জনপদে।

মোলানী গ্রামের মাঠজুড়ে এখন আর ডিজেল ইঞ্জিনের বিকট শব্দ নেই, নেই কালো ধোঁয়ার দূষণও। চাকা লাগানো বিশেষ কাঠামোর ওপর বসানো সৌর প্যানেলে সূর্যের আলো পড়তেই সচল হয়ে ওঠে সেচযন্ত্র। মাটির নিচ থেকে উঠে আসে স্বচ্ছ পানির ধারা, যা জমির আল বেয়ে ফসলের তৃষ্ণা মেটায়।

অভাবের কারণে প্রথম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করা হয়নি সোলেমান আলীর। কিন্তু দীর্ঘদিনের কারিগরি অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ২ হাজার ৫০০ ওয়াট ক্ষমতার একটি ভ্রাম্যমাণ সেচযন্ত্র। সূর্যের আলো পেলেই এটি তিন হর্সপাওয়ারের পানির পাম্প চালু করে, যা প্রতি মিনিটে প্রায় ৭০০ লিটার পানি তুলতে সক্ষম।

এই প্রযুক্তির সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় কয়েক শ কৃষক। সদর উপজেলার আরাজি ঝাড়গাঁও গ্রামের কৃষক আবু বকর বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় আবাদ করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আবার ঠিকমতো পানি না দিলে ফলন কমে যায়। এখন সোলেমান ভাইয়ের সৌর পাম্পে দিনে রোদ থাকতে থাকতেই সেচের কাজ শেষ হয়ে যায়। খরচও অনেক কম।’

রাণীশংকৈল উপজেলার কৃষক মনসুর আলীও এই সেচযন্ত্রকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আগে বিদ্যুতের জন্য রাত জেগে বসে থাকতে হতো। লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো পানি দিতে পারতাম না। এখন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সূর্যের আলোতেই কাজ হয়ে যায়। তেল কেনার ঝামেলাও নেই।’

সূর্যের আলো পেলেই ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্রটি তিন হর্সপাওয়ারের পানির পাম্প চালু করে, যা প্রতি মিনিটে প্রায় ৭০০ লিটার পানি তুলতে সক্ষম। ছবি: আজকের পত্রিকা
সূর্যের আলো পেলেই ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্রটি তিন হর্সপাওয়ারের পানির পাম্প চালু করে, যা প্রতি মিনিটে প্রায় ৭০০ লিটার পানি তুলতে সক্ষম। ছবি: আজকের পত্রিকা

বর্তমানে সোলেমান আলীর কাছে রয়েছে ২৬টি সৌর প্যানেল ও পাম্প। এর মধ্যে ছয়টি তিনি নিজেই পরিচালনা করেন। বাকি ২০টি পাম্প মৌসুমি ভিত্তিতে কৃষকদের কাছে ভাড়া দেন। প্রতিটি পাম্প মৌসুমে ৩৬ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়ে তিনি এলাকায় নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন। এতে কৃষকদের ব্যক্তিগতভাবে পাম্প কেনার প্রয়োজন হয় না, আবার সাশ্রয়ী মূল্যে সেচ সুবিধাও মিলছে।

সোলেমান আলীর হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এই উদ্যোগ থেকে তাঁর আয় হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। চলতি মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আয় ৮ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কেবল ব্যক্তিগত আয়েই সীমাবদ্ধ নন সলেমান। তাঁর এই প্রযুক্তির সুফল এখন ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্তজোড়া মাঠে। বর্তমানে তাঁর তৈরি করা সোলার পাম্প দিয়ে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

নিজের স্বপ্ন নিয়ে সোলেমান আলী বলেন, ‘আমি প্রথম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা করতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু কৃষকের হাহাকারটা বুঝি। ডিজেল আর বিদ্যুতের সংকটে যখন মাঠ শুকিয়ে যেত, তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগানোর। আজ যখন দেখি কোনো খরচ ছাড়াই হাজার হাজার বিঘা জমি ভিজে যাচ্ছে, তখন বুকটা ভরে ওঠে। যদি সরকারি সহযোগিতা পেতাম, তবে এই উদ্ভাবিত সেচযন্ত্র কৃষকদের জন্য সারা দেশে ছড়িয়ে দিতাম।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম মনে করেন, সোলেমানের এই উদ্ভাবন কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং বর্তমান জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান। তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন আরও গতিশীল হবে। সংকটের মেঘ কাটিয়ে সোলেমানের এই উদ্ভাবন যেন উত্তরের জনপদে আগামীর আধুনিক কৃষির এক নতুন বার্তা দিয়ে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত