Ajker Patrika

ঘোড়া পালনের নেশায় আজ সফল উদ্যোক্তা আবুল হাশেম

সাইফুল ইসলাম সানি, সখীপুর (টাঙ্গাইল)
ঘোড়া পালনের নেশায় আজ সফল উদ্যোক্তা আবুল হাশেম

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বহুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল হাশেম (৬৮)। জেলাজুড়ে তিনি পরিচিত এক ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে। ছোটবেলা থেকে ঘোড়ার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। সেই শখ একসময় তাঁকে এনে দিয়েছে সাফল্য, পরিচিতি ও সম্মান।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আবুল হাশেমের বাবা বছির উদ্দিন ছিলেন তৎকালীন ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। বাবার হাতি-ঘোড়া দেখে ছোটবেলা থেকে ঘোড়ার প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয় হাশেমের। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবা মারা যান। পরিবারের লোকজন তাঁর রেখে যাওয়া হাতি-ঘোড়া বিক্রি করে দেয়। বছর তিনেক পর ছেলের আবদার মেটাতে একটি ঘোড়া কিনে দেন মা শাবজান বেগম, সেই থেকে শুরু...।

ঘোড়া পালনের নেশায় তেমন পড়াশোনাও করা হয়নি হাশেমের। তবে জীবন তো আর থেমে থাকে না। পুরোনো সেই প্রবাদ ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’ মিথ্যা প্রমাণ করে যেন আজ গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আবুল হাশেম।

সম্প্রতি উপজেলার বহুরিয়া গ্রামে ঘোড়ার খামারে গেলে আবুল হাশেম তাঁর সফলতার গল্প শোনান। শুরুতে ঘোড়া পালনের পাশাপাশি একটি বাস কিনে পরিবহনের ব্যবসা শুরু করেছিলেন আবুল হাশেম। তৎকালীন ব্যবসা ভালো হওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ১৩টি বাসের মালিক হয়ে যান। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার প্রচলন বেড়ে যাওয়ায় গাড়ির ব্যবসা কমিয়ে ঘোড়ার খামার করেন। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে মাড়োয়ারি, থ্রপিট, সিন্ধি, দেশিসহ বিভিন্ন জাতের ঘোড়া। জাতভেদে ২ থেকে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের ঘোড়া রয়েছে খামারে। ভারত থেকে ঘোড়া এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিক্রিও করা হয়। সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত ঘোড়া সরবরাহ করেছেন তিনি।

আবুল হাশেম বলেন, শুধু ঘোড়া কেনাবেচা নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেয় তাঁর খামারের ঘোড়া। সাতক্ষীরা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় তাঁর ঘোড়াগুলো অসংখ্য পুরস্কার জিতেছে। ফলে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর খ্যাতি।

আবুল হাশেম আরও বলেন, তাঁর ঘোড়া ব্যবহার করে দেশের জনপ্রিয় নারী সাওয়ারি তাসলিমা, হালিমা, দিঘি, সোনিয়াসহ অনেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জন করেছেন।

হাশেমের খামারে প্রায় পাঁচ বছর ধরে সাওয়ারি হিসেবে কাজ করছেন সোহেল মিয়া (১৫)। সোহেলের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকে ঘোড়ার প্রতি তাঁরও আগ্রহ ছিল। বাবা তাঁকে ঘোড়া চালানো শেখানোর জন্য আবুল হাশেমের খামারে নিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে তিনি একজন পরিচিত সাওয়ারি হয়ে উঠেছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘোড়দৌড়ে অংশ নিয়ে পুরস্কারও জিতেছেন। ঘোড়ার নেশায় পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন, একদিন দেশসেরা সাওয়ারি হওয়া।

আবুল হাশেমের বড় ছেলে রাহাত হাসান বলেন, ‍‘আমার বাবা তাঁর সন্তানের থেকেও ঘোড়াগুলোকে বেশি সময় দেন। আমি চাই, এই যান্ত্রিকতার জীবন থেকে তিনি ওদের সঙ্গে (ঘোড়া) আনন্দে বেঁচে থাকুন হাজার বছর। পৃথিবীর সকল বাবার হাসিটাই হোক সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।’

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও কলেজশিক্ষক মোজাম্মেল হক বলেন, একসময় রাজা-বাদশা ও জমিদারদের বাহন ছিল হাতি-ঘোড়া। তাঁরা হাতি-ঘোড়া নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। এই আধুনিক যুগে এসেও আবুল হাশেম ঘোড়া নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ান। আবুল হাশেম আধুনিক যুগের রাজা। 

অনুভূতি জানতে চাইলে আবুল হাশেম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমার পাজেরো গাড়ি আছে, সেই গাড়ি নিয়ে কোথাও গেলে যে শান্তি পাই, এর চেয়ে বেশি শান্তি আর সম্মান পাই ঘোড়া নিয়ে গেলে। তাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঘোড়া লালন-পালন করে যেতে চাই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত