Ajker Patrika

টাঙ্গাইলের ভাসানী হল: ট্রাকস্ট্যান্ডের দখলে চত্বর, হল পরিত্যক্ত

  • প্রায় হাজার আসনবিশিষ্ট মিলনায়তনটি একসময় অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
  • ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় প্রায় এক যুগ আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে প্রশাসন।
  • হলটির সঙ্গে অনেকটা থমকে গেছে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।
  • ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীসহ বিশিষ্টজনেরা।
আনোয়ার সাদাৎ ইমরান, টাঙ্গাইল
টাঙ্গাইলের ভাসানী হল: ট্রাকস্ট্যান্ডের দখলে চত্বর, হল পরিত্যক্ত
ভাসানী হল এখন প্রায় পরিত্যক্ত। চত্বরে রাখা ট্রাক, বারান্দায় পানের দোকান। গতকাল টাঙ্গাইল সদরের টাউন হল এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসময় টাঙ্গাইল শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ছিল ঐতিহ্যবাহী ভাসানী হল। ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় এখন জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এই ভাসানী হলে নেই প্রাণচাঞ্চল্য। এই হল এক যুগের বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত। এর বারান্দায় বসছে পানের দোকান। এর চত্বর দখল করেছে ট্রাকস্ট্যান্ড। বসে মাদকের আড্ডা। সাংস্কৃতিক কর্মীরা দ্রুত হলটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর টাঙ্গাইল টাউন হল নামে মিলনায়তনটি নির্মিত হয়েছিল। ১৯৭৬ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৭৮ সালের ২ এপ্রিল মিলনায়তনটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন ঢাকা বিভাগের কমিশনার খানে আলম খান। পরে টাঙ্গাইল পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান সামছুল হকের উদ্যোগে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ভাসানী হল।

স্থানীয় প্রবীণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, আগে পাড়া-মহল্লায় অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল। বিভিন্ন উপলক্ষে তারা নাটকের আয়োজন করত এবং পুরো টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এই ভাসানী হলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। প্রায় এক হাজার আসনবিশিষ্ট এই মিলনায়তনটি একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কয়েক দশক ধরে টাঙ্গাইলের নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, বইমেলা এবং রাজনৈতিক সমাবেশের প্রধান ভেন্যু ছিল এটি। প্রতিবছর ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নামকরা থিয়েটার দল আসত, হতো নাট্যোৎসব। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই সংগঠনগুলো হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংস্কারের অভাবে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রায় এক যুগ আগে এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে প্রশাসন। হলটির দেয়ালেও বড় ফাটল ধরেছে, ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে।

টাঙ্গাইলের অন্যতম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তরুণ ইউসুফ বলেন, টাঙ্গাইলকে সাংস্কৃতিক নগরী বলা হয়। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক নগরীর জন্য একটি সুন্দর মানসম্মত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই। একসময় ভাসানী হল ঘিরে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল, তা বন্ধ হয়ে গেছে এক যুগ আগেই। তাই দ্রুত ভাসানী হল পুনর্নির্মাণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়রা মনে করেন, ভাসানী হল শুধু একটি কংক্রিটের ভবন নয়; এটি টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেলার গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি।

টাঙ্গাইলের শৈলী শিল্প চর্চা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মৌসুমী রহমান বলেন, টাঙ্গাইলে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ খুবই জরুরি। একসময় ভাসানী হল আমাদের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ভাসানী হল পুনর্নির্মাণ হলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়বে।

টাঙ্গাইলের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুরকার-গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী ফিরোজ আহমেদ বাচ্চু বলেন, এই মিলনায়তনটি ঘিরেই নাট্যচর্চাসহ সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত আড্ডা বসত। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এর চত্বরে হতো বইমেলা। ঈদের সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্টের আয়োজন করত। এ ছাড়া এ ভাসানী হলে জেলার অনেক রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও অনুষ্ঠিত হতো। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূল কেন্দ্র ছিল হলটি। অথচ সেই হল দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও ঝিমিয়ে পড়েছে।

কবি মাহমুদ কামাল বলেন, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত এ হলটিকে পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করার দাবি ছিল। হলটি মওলানা ভাসানীর নামে থাকায় বিগত সরকার সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি, ভাসানী হলটি পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হোক।

টাঙ্গাইল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান খান বলেন, মাদকের ছোবল এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত থেকে মুক্তি পেতে হলে ক্রীড়া অঙ্গন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মুখরিত রাখতে হবে। তাই সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গতিশীল করতে ভাসানী হল খুবই প্রয়োজন।

টাঙ্গাইল সদর আসনের এমপি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু গত ১২ জুন হলটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি দ্রুত এই ঐতিহাসিক হলটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, ভাসানী হল টাঙ্গাইলের জন্য অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। এটি পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত