Ajker Patrika

হবিগঞ্জের প্রান্তিক এলাকায় ‘আইসিবিসি’ প্রকল্পের আলো: শিশুরা সুরক্ষিত, নিশ্চিন্ত কর্মজীবী মা

সহিবুর রহমান, হবিগঞ্জ 
হবিগঞ্জের প্রান্তিক এলাকায় ‘আইসিবিসি’ প্রকল্পের আলো: শিশুরা সুরক্ষিত, নিশ্চিন্ত কর্মজীবী মা
শিশু যত্নকেন্দ্রে এভাবেই শিশুদের পাঠদান ও সুরক্ষা দেওয়া হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সকাল থেকে দুপুর—দিনের এই কর্মব্যস্ত সময়ে শিশুদের দেখভাল ও সুরক্ষা নিয়ে সব মা-বাবাকে চিন্তায় থাকতে হয়। তখন নারী-পুরুষ সবাই পেশাগত ও গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, তখন ঘরের শিশুটি খেলতে খেলতে সবার অগোচরে একসময় ডোবানালায় পড়ে যায়। হবিগঞ্জ জেলায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলোর কারণ অধিকাংশ এমনই। তবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশু যত্নকেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্প’-এর কারণে হবিগঞ্জের প্রান্তিক এলাকার গল্প এখন ভিন্ন। এই প্রকল্পের শিশু যত্নকেন্দ্রগুলো গ্রামীণ নারীদের কর্মব্যস্ত জীবনে স্বস্তি এনে দিয়েছে।

হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল, মাধবপুর ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার প্রান্তিক এলাকায় প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি এনজিও সংস্থা ‘নতুন প্রজন্ম উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে শিশু যত্নকেন্দ্র ও জীবন রক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ।

শিশু যত্নকেন্দ্রে খেলাধুলায় মেতে উঠেছে শিশুরা। ছবি: আজকের পত্রিকা
শিশু যত্নকেন্দ্রে খেলাধুলায় মেতে উঠেছে শিশুরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

জানা যায়, হবিগঞ্জের বাহুবল, মাধবপুর ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় এই প্রকল্পের অধীনে ৫০০ যত্নকেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ১ থেকে ৫ বছর বয়সী সাড়ে ১২ হাজার শিশুকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে প্রারম্ভিক শিক্ষা। একই সঙ্গে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ২৪ হাজার ৯৫০ শিশুকে শেখানো হয়েছে সাঁতার।

শিশুদের সাঁতার শেখানো হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা
শিশুদের সাঁতার শেখানো হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ, শিক্ষা এবং যত্ন প্রদান নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আইসিবিসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। এর উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন (আরএনএলআই)। আর কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে সিনারগোস বাংলাদেশ, সিআইপিআরবি ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক আইইডি।

জেলার বাহুবল উপজেলার রশিদপুর চা-বাগানে যত্নকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সকালে চা-বাগানের কর্মজীবী মায়েরা তাঁদের ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুকে যত্নকেন্দ্রে দিয়ে যান। আবার বেলা ২টায় এসে শিশুদের কেন্দ্র থেকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। এই সময়ের মধ্যে একজন যত্নদানকারী থাকেন। যাঁকে কেয়ারগিভার নামে অভিহিত করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন সহকারী কেয়ারগিভারও থাকেন। এই দুজনের মাধ্যমে যত্নকেন্দ্রে শিশুরা শারীরিক, সামাজিক, আবেগিক, ভাষাগত ও জ্ঞানবুদ্ধি বিকাশের শিক্ষা পায়। এতে কর্মব্যস্ত দিনে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে শিশুরা থাকছে সুরক্ষিত আর মা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারছেন।

রশিদপুর চা-বাগানের নারী চা-শ্রমিক সন্ধ্যা বাউরি বলেন, ‘আমি কাজে যাই। আর বাচ্চাটা দুইটা পর্যন্ত ক্লাস করে। আমাদের বাচ্চাকাচ্চা ভালো থাকে বলে আমরা শিশুকেন্দ্রে দিয়ে যাই। আমি কাজ শেষ করে এসে আমার ময়নাটাকে নিয়ে যাই।’

আরেক চা-শ্রমিক অঞ্জলী ভৌমিক বলেন, ‘আমাদের একটা শিশুকেন্দ্র আছে, সেখানে আমরা বাচ্চা রেখে যাই। অনেক নিরাপদ থাকে সেখানে। আর আমরা নিরাপদভাবে কাজকর্ম করে আসতে পারি। আমরা চাই, এভাবে যেন কেন্দ্রটি ভালোভাবে চলে।’

কেন্দ্রটির যত্নদানকারী কণিকা তাঁতী বলেন, ‘আমার এখানে ২৫ জন শিশু আছে। ২৫ জনের মধ্যে সবাই প্রতিদিন উপস্থিত থাকে। কেউ অসুস্থ থাকলে অনুপস্থিত থাকতে পারে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় মায়েরা বাচ্চাদের এখানে রেখে যান। আপন ভুবন, স্বপ্নের ভুবন, গল্পের ভুবন, রঙিন ভুবন ও বাহিরের ভুবন—এই পাঁচ নামে আমরা শিশুদের গান, কবিতা, চিত্রাঙ্কন, ছড়া, খেলাধুলা ও খেলনা তৈরি করা শিখিয়ে থাকি। যে কারণে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করছে।’

হবিগঞ্জে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ‘নতুন প্রজন্ম উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের’ প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। যত্নকেন্দ্র থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুরা ক্লাসের অন্যদের চেয়ে ভালো করছে। তারা সৃজনশীল চর্চায় আগ্রহ দেখাচ্ছে।’

প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কে রবিউল ইসলাম জানান, আইসিবিসি প্রকল্পে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। প্রতিনিয়ত অভিভাবক সভা হয়। যার মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্মনিবন্ধন-বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যেসব এলাকায় এই প্রকল্প চলছে, সেখানে শিশুমৃত্যুর হার অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যুও কমতে শুরু করেছে।

হবিগঞ্জ জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা দিল আফরোজ কাঞ্চি বলেন, হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল, মাধবপুর ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় আইসিবিসি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অন্যান্য এলাকার চেয়ে এই তিন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে গেছে। শিশুদের আহত হওয়ার সংখ্যাও কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে মায়েরা আমাদের শিশুকেন্দ্রে বাচ্চাদের রেখে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে। বিভিন্ন সময়ে যে শিশুদের রোগ হয়, সে সম্পর্কে আমরা অভিভাবকদের অবহিত করি। এ ছাড়াও জন্মনিবন্ধন, টিকা দেওয়ার যে সুবিধা, তা জানতে পেরে অভিভাবকেরা সচেতন হচ্ছেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত