Ajker Patrika

বেদখল জমি উদ্ধারের মাধ্যমে শহীদ ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতে চান মা

খোরশেদ আলম সাগর, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
বেদখল জমি উদ্ধারের মাধ্যমে শহীদ ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতে চান মা
শহীদ মিরাজুল ইসলাম মিরাজের বাড়িতে তাঁর মা। ছবি: আজকের পত্রিকা

মেধাবী ছাত্র মিরাজুল ইসলাম মিরাজ বলেছিলেন, ‘মা, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করব, তোমার জমি উদ্ধার করে একটা সুন্দর বাড়ি করব।’ কিন্তু সেই স্বপ্নের আগেই নিভে গেছে মিরাজের জীবনপ্রদীপ। এখন ছেলের রেখে যাওয়া সেই জমিটুকু দখলে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন মা মোহছেনা বেগম।

গত বছর ঢাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া গ্রামের মিরাজ। তিনি ছিলেন মৃত আব্দুস ছালামের বড় ছেলে। মাত্র ৫ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করার ইচ্ছে ছিল তাঁদের। কিন্তু প্রতিবেশী দুলাল মণ্ডল দলিল থাকা সত্ত্বেও জমিটি দখলে নিতে দেননি। পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও কোনো ফল মেলেনি।

গত বছর জুলাই আন্দোলনে ৫ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার সামনে মাছের আড়ত এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ৮ আগস্ট রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিরাজের মৃত্যু হয়।

সরেজমিন শহীদ মেরাজের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চাচা কালাম মিয়ার জমিতে একটা লম্বা টিনশেড ঘরের মাঝে পাটিশন দিয়ে তৈরি করা দুটি কক্ষ। সেই দুই কক্ষেই শহীদ পরিবারের বসবাস। ডোরা নদীর পারঘেঁষা বাড়ি তাঁদের। বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটি সাম্প্রতিক সময় সরকারিভাবে করে দেওয়া হয়েছে।

মিরাজের পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, ২০২১ সালে এসএসসি পাস করে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক বাবার সঙ্গে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় পাড়ি জমান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ। সেখানে ভাড়া বাসায় থাকত মিরাজের পুরো পরিবার। ঢাকা দনিয়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন মিরাজ। পড়ালেখার পাশাপাশি একটি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন মিরাজ। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়াসহ পুরো সংসার চলত মিরাজের আয়ে।

গত বছর ৫ আগস্ট হাসিনা পদত্যাগের এক দফা আন্দোলনে অন্যদের মতো যাত্রাবাড়ী থানার সামনে মাছের আড়ত এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেন মিরাজ। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত মিরাজকে স্থানীয়রা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করা হয়। ৮ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মিরাজের মৃত্যুতে নিভে যায় তাঁদের সংসারের আলো। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা পুরো পরিবার। কষ্টার্জিত টাকায় কেনা ৫ শতাংশ জমিতে বাড়ি করার স্বপ্নে ঢাকায় পাড়ি জমায় মিরাজের পরিবার। তা মাঝপথে নিভে যায়। জমিটুকুও হয়ে যায় বেদখল। দলিল দিলেও দখল দেননি দাতা প্রতিবেশী দুলাল। সে জমি দখলে নিতে থানা-পুলিশ করেও সুফল মেলেনি। হারতে হয়েছে টাকার কাছে। পড়ালেখা শেষে চাকরি করে বেদখলীয় জমি উদ্ধার করে বাড়ি করেই তবে ঢাকা থেকে ফেরার স্বপ্ন ছিল মিরাজের।

ছেলের মৃত্যুর শোকে অসুস্থ বাবা আব্দুস ছালাম বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করে সরকারি পাঁচ লাখ টাকা পান। সে টাকায় মহিষখোঁচা বাজারে একটা খাসজমিতে দোকান করে ব্যবসা শুরু করেন আব্দুস ছালাম। হঠাৎ তিনিও স্ট্রোক করে মারা যান। আবারও অমানিশায় ডুবে যায় মিরাজের পরিবার।

বড় ছেলে আর স্বামীকে হারিয়ে নির্বিকার শহীদ জননী মোহছেনা বেগম। সংসারের খাদ্য জোগাতে বাধ্য হয়ে শহীদ মিরাজের স্কুলপড়ুয়া ছোট ভাই মেজবাউল ও সিরাজুল দোকান করছে। স্কুলে গেলে বন্ধ হয় দোকান, আর দোকান চালু রাখলে বন্ধ হয় স্কুলে যাওয়া।

শহীদ মিরাজের দাদি সালমা খাতুন বলেন, ‘আগে নাতি মিরাজ আমার ওষুধসহ চিকিৎসার দেখভাল করত। তার মৃত্যুর পরে ছেলে ছালাম ওষুধের ব্যবস্থা করত। এখন ছোট ছোট দুই নাতি স্কুলের ফাঁকে দোকান করে যা আয় করছে তা দিয়ে কোনো রকম খাবার জুটছে।’

শহীদ মিরাজের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাইরে অনেক প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে শহীদ পরিবারকে কোটি কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে পাঁচ লাখ টাকা আর বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটা ছাড়া কিছুই পাইনি। আমাদের ক্রয় করা জমি বেদখল থেকেও উদ্ধার করে দিতে পারেননি সরকারি কর্মকর্তারা। তাঁরা শুধু বুলি আওড়ায়। ভাইকে কারা গুলি করল? তার সঠিকটা জানতে চাই। চাই দ্রুত খুনিদের বিচার।’

মিরাজের মা মোহছেনা বেগম বলেন, ‘বাড়ির জন্য কেনা জমিটুকু দখল পেতে থানা-পুলিশ করেছিল মিরাজ আর তার বাবা। কিন্তু টাকার কাছে আমরা হেরে যাই। কথা শোনেনি হাসিনা সরকারের পুলিশ। তখন মিরাজ বলছিল, “মা চিন্তা কোরো না, আমি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে এ জমি উদ্ধার করে বাড়ি করে দেব।” আমার ছেলের এ স্বপ্ন আজও পূরণ করতে পারিনি। সরকারি লোকদের বলেছি, তাঁরাও আশ্বাস দিয়ে চলে যান। দ্বিতীয়বার আর আসেন না।’

তিনি বলেন, ‘বাজারের খাসজমিটুকু দখল করে দিয়েছে বিএনপি। সে জায়গায় দোকানঘর নির্মাণ করে ব্যবসা শুরু করতে সরকারিভাবে পাওয়া পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সরকারি জায়গা দখল দিয়ে বিএনপি প্রচার করল আমাদের দোকান সাজিয়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে শুধু জামায়াত নেতারা ফোন করে খবর নেন। তা ছাড়া আর কেউ খবর নেয়নি। ছেলে ও স্বামীকে হারানো আমি কেমন আছি? স্বামী হারালে সন্তানকে নিয়ে শোক হালকা করা যায়। কিন্তু আমি তো ছেলে-স্বামী দুজনকেই হারাইছি। আমার মতো দুঃখী বুঝি কেউ নাই।’ এই বলেই কান্না শুরু করেন তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ বলেন, ‘কোনো নাগরিকের জমি জবর দখলের সুযোগ নেই। সেখানে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের হলে তো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব পাবে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করবে এনসিপি।’

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ‘শহীদ পরিবারের জমি বেদখলের বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এখন টিভির ঘটনা সমঝোতার চেষ্টা করবেন তথ্যমন্ত্রী

ড. ইউনূস এখন কোথায় আছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী উঠবেন কোথায়?

২৬ ফেব্রুয়ারি বসতে পারে সংসদের প্রথম অধিবেশন, সভাপতিত্ব করবেন কে

ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করবে সরকার, হবে সর্বজনীন

বৈধ সুবিধাকে অস্বীকার করে জনগণের সামনে সাধু সাজা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত