Ajker Patrika

মারধরের শিকার সেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
মারধরের শিকার সেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগম। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগমকে ভোটকেন্দ্রের সামনে প্রকাশ্যেই চড়-থাপ্পড় মারার ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। হাবিবার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মো. আকবর হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতেই রাজশাহীর কাটাখালী থানায় অভিযোগ দিয়ে এসেছেন। তবে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত মামলা রেকর্ড করা হয়নি।

চড়-থাপ্পড় মারার পর থেকে হাবিবা বেগম কানে শুনতে পাচ্ছেন না। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি হাসপাতালের ৫ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসক তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রেখেছেন।

শুক্রবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাবিবা ঘুমিয়ে আছেন। তার দুই বছর বয়সী সন্তানকে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছিল। শিশুটির বাবা মাসুদ রানা নানা উপায়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেও সে বার বার মায়ের বিছানার দিকে যেতে চাইছিল।

হাসপাতালেই ছিলেন হাবিবার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মো. আকবর হোসেন। চিকিৎসকের দেওয়া ঘুমের ওষুধের কারণে হাবিবাকে ডাকা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি জানান। আকবর হোসেন জানান, ঘটনার ব্যাপারে মামলা করতে রাতেই কাটাখালী থানায় গিয়ে অভিযোগ দেন। কিন্তু থানায় দায়িত্বরত কর্মকর্তা জানান, থানায় এখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেই। তাই মামলা রেকর্ড হবে না। থানায় মামলা রেকর্ড না করার কারণে রাতেই তিনি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ভোটকেন্দ্রের আনুমানিক ১০০ গজ উত্তরে হাবিবা বেগম ও তার নির্বাচনী কর্মীদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা কামনা করা হয়।

হাবিবা বেগম মোহনপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে প্রতীক বরাদ্দ পান ভোটের মাত্র ছয় দিন আগে। হাবিবা উপজেলা কৃষক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। অল্প সময়ে তিনি সব এলাকায় প্রচারে যেতে পারেননি। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটে ভাইস চেয়ারম্যান হওয়া হাবিবা এবার দুই উপজেলায় ভোট পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ১১৭ টি।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোটগ্রহণ চলাকালে বেলা তিনটার দিকে তিনি পবা উপজেলার নলখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে যান। সেখানে তিনি ভোটারদের কাছে ভোটও চাইছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হন হরিয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি রজব আলী।

হামলার সময়ের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কতর্কবিতর্কের একপর্যায়ে রজব আলী হঠাৎ হাবিবা বেগমকে সজোরে একটি থাপ্পড় মারেন। এতে হাবিবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়। কোনোমতে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে তাকে আবারও থাপ্পড় মারা হয়। পরে হাবিবার সঙ্গে থাকা লোকজন তাকে রক্ষা করেন। এ সময় আরেক ব্যক্তি অভিযুক্তকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।

ঘটনার পর হাবিবা বেগম দুই বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে ভোটকেন্দ্রের সামনে একটি চেয়ারে বসে থাকেন। তখন তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও ভোট প্রার্থনা করছিলেন। প্রচারণায় আগে আসতে না পারায় ভোটারদের কাছে ফুটবল প্রতীকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ করছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রজব তাকে মেরেছেন।

তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মো. আকবর হোসেন বলেন, হামলার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। তবে তার আগেই পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে আসে। সবকিছু শোনার পর হামলাকারীদের সঙ্গে দূরে গিয়ে কথা বলে পুলিশ চলে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, হামলার কারণে প্রার্থী মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।

হামলার বিষয়ে বৃহস্পতিবার হরিয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি রজব আলী বলেন, তিনি জানতেন না যে ওই নারী নিজেই ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী। ভোটের দিন ভোট চাওয়া ঠিক নয়, এ কারণে তিনি নিষেধ করতে যান। তখন তাকে অশালীন ভাষায় গালি দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি একটি থাপ্পড় মারেন বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘কাল বিএনপি সরকার গঠন করবে। আমার ইজ্জতে খুব লেগেছে। ও এখন মামলা করুক বা যা খুশি করুক।’

বৃহস্পতিবার বিকেলে কাটাখালী থানার ওসি সুমন কাদেরী বলেন, ভোটকেন্দ্রের সামনে ভোট চাওয়া নিয়ে এক প্রার্থীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডার কথা শুনেছেন। তবে মারধরের ঘটনা তার জানা নেই। শুক্রবার দুপুরে যোগাযোগ করা হলে ওসি বলেন, মারধরের ভিডিও তিনি দেখেছেন। মামলা না নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাতে তারা অভিযোগ দিয়ে গেছে। ব্যস্ততার কারণে রাতে থানায় যেতে পারিনি। এখন পর্যন্ত সেটি দেখা হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এটা ভোটকেন্দ্রের ঘটনা। রিটার্নিং কর্মকর্তাও দেখতে পারতেন।’

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার রাজশাহীর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেছিলেন, তিনি মারধরের ভিডিও দেখেছেন। হাবিবা চাইলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত বিচার হতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত