Ajker Patrika

হাতিয়ায় অপরিকল্পিত খাল খননের অভিযোগ, ভাঙনের ঝুঁকিতে ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি 
হাতিয়ায় অপরিকল্পিত খাল খননের অভিযোগ, ভাঙনের ঝুঁকিতে ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট
অপরিকল্পিতভাবে খাল খননের ফলে ভেঙে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। হাতিয়ার তমরদ্দি কাটাখালী এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

নোয়াখালীর হাতিয়ায় অপরিকল্পিতভাবে খাল খননের ফলে ভেঙে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। কোথাও রাস্তা ভেঙে পড়ছে কৃষিজমিতে। ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় চার কিলোমিটার লোনা পানির বেড়িবাঁধ। স্বাভাবিক জোয়ারেই প্লাবিত হচ্ছে ছয়-সাতটি গ্রাম। অপরিকল্পিত খাল খননের ফলে দীর্ঘ পাঁচ কিলোমিটার জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। এ চিত্র নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নের।

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি নিষ্কাশনের জন্য তমরদ্দি-কাটাখালী খালটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে এ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল ইথিন এন্টারপ্রাইজ। গত বছর শীত মৌসুমে দীর্ঘ খালটির খননকাজ শেষ হয়।

স্থানীয়রা জানান, খননকাজে বেকু মেশিন ব্যবহার করা হয়। এতে খালের দুই পাড়ের গাছপালা কেটে ফেলা হয়। মেশিনের সাহায্যে গভীরভাবে খনন করা এবং পাড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢাল না রাখায় বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই তীব্র স্রোতে খালের পাড় ভেঙে যায়। এরপর নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দুই পাশের মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি ভাঙতে শুরু করে।

দাসের হাট বাজারের উত্তর পাশে সেতুর কাছে প্রবাসী জামালের বাড়ি। জামাল জানান, গত বছর বিদেশ থেকে এসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে তিনি আধাপাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়ির উত্তর পাশের খালের পাড় ভেঙে যায়। কিছুদিন পর বাড়ির একটি অংশও ভাঙনের কবলে পড়ে। বর্তমানে রান্নাঘরটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে রান্নাঘরটি ভেঙে গেলে মূল বসতঘরটিও ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন, শীত মৌসুমে খাল খননের সময় বাড়ির নারীরা বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিকাদার নিজের মতো করে খাল থেকে মাটি কেটে নেন। এতে খালের গভীরতা বেড়ে যাওয়ায় স্রোতের তোড়ে এখন মানুষের ঘরবাড়ি ভাঙছে।

জোড়খালী গ্রামের বাসিন্দা আজগর হোসেন জানান, খালের প্রথম অংশে দুই পাড়ে যে বেড়িবাঁধ রয়েছে, সেটি প্রায় চার গ্রামের মানুষকে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। এখন অপরিকল্পিতভাবে খাল খননের ফলে সেই বেড়িবাঁধও ভেঙে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় বাঁধ ভেঙে কোনোমতে টিকে আছে। এতে সামনের পূর্ণিমার জোয়ারে বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হাতিয়া উত্তর বেজুগালিয়া থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা
হাতিয়া উত্তর বেজুগালিয়া থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্থানীয়রা জানান, পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের দুই পাশে ঘনবসতি রয়েছে। নদী থেকে শুরু হয়ে প্রথম দুই কিলোমিটার অংশের দুই পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু বেড়িবাঁধের পাশে গভীর গর্ত করে মাটি কাটায় এখন সেই বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে দুই পাড়ে বসবাস করা মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

কাটাখালী খালের গোড়া থেকে লোহার পোল পর্যন্ত দুই পাশে তিন শতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। তাঁদের একজন আবুল হাসেম (৬৭)। তিনি জানান, নদীভাঙনের শিকার হয়ে ২০ বছর ধরে তিনি এখানে বসবাস করছেন। হঠাৎ খাল খননের ফলে এখন বেড়িবাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে স্রোতে তাঁর রান্নাঘর ভেসে গেছে। এখন তিনি মূল ঘরেও বসবাস করতে পারছেন না। ঘরের আসবাব বেড়িবাঁধের ওপর প্রতিবেশীদের ঘরে রেখে দিয়েছেন।

হাসেম আরও জানান, এই অংশে খাল খননের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এখানে খাল এমনিতেই অনেক প্রশস্ত। পানি আসা-যাওয়ায় কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু খনন করে খালটিকে আরও প্রশস্ত ও গভীর করায় এখন এটি নদীতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুর হোসেন সুমন বলেন, খাল খনন করা হয় মূলত পানি নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য। কিন্তু কাটাখালীর এই খালটি আগে থেকেই অনেক প্রশস্ত ছিল। অপরিকল্পিতভাবে এটি খনন করা হয়েছে। যে দপ্তর কাজের নকশা তৈরি করেছে, তা বাস্তবসম্মত ছিল না। যে অংশে খাল খননের প্রয়োজন ছিল না, সেই অংশ খনন করা হয়েছে। এতে স্রোতের তীব্রতা বেড়েছে। আবার যে অংশে খননের প্রয়োজন ছিল, সেখানে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হয়নি। ফলে এই খাল খনন মানুষের উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাতিয়া তমরদ্দি কাটাখালী এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা
হাতিয়া তমরদ্দি কাটাখালী এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

তিনি আরও জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এলজিইডি কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। তাঁরা সরেজমিন পরিদর্শনও করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

এ বিষয়ে ঠিকাদারের প্রতিনিধি আমিরুল ইসলাম আইয়ুব চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ডিজাইন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করেছি। কর্মকর্তারা আমাদের কাজ পরিমাপ করে বুঝে নিয়েছেন। সরকারের একাধিক দপ্তর থেকে এ কাজ বুঝে নেওয়ার জন্য কর্মকর্তারা এসেছেন। সবাই কাজের মান নিয়ে সন্তুষ্ট। এখানে কাজে ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ নেই।’

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী ইমদাদুল হক বলেন, যেকোনো কাজের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ঢাকায় নকশা তৈরি করা হয়। সেই নকশা অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন করতে হয়। সেখানে এক ইঞ্চি কমবেশি মাটি কাটারও সুযোগ নেই। তিনি বলেন, কাজটি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ বছর অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে খালের দুই পাড় ভাঙতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত