উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় গত ২২ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম পাসের হার। শিক্ষা বোর্ডগুলোর গড় পাসের হার ও সর্বোচ্চ ফলের সূচক জিপিএ-৫ দুটিই কমেছে। এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক অকৃতকার্য হয়েছেন। কমেছে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। অন্যদিকে বেড়েছে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
গতকাল শনিবার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। এর পাশাপাশি মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের খারাপ ফল, পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরীক্ষা নেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতাও সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে এমন ফলাফল অপ্রত্যাশিত নয় বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, নানা সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। ফলে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনও সম্ভব হচ্ছে না।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে এবারের ফলাফলেও প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি। কারণ, প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষা, যা আমাদের নেই। ইংরেজি ও আইসিটিতে খারাপ করার অন্যতম কারণ দক্ষ শিক্ষকের অভাব। এদিকে নজর দিতে হবে।’
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বরে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৪ সালের পর চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার সবচেয়ে কম। ২০০৪ সালে গড় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২০ সালে অটোপাসের মাধ্যমে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিলেন। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল রেকর্ড ৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
ইংরেজি-আইসিটিতে বেশি অকৃতকার্য
চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। এর মধ্যে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন অকৃতকার্য হয়েছেন।
ফলাফল বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ড ছাড়া বাকি আটটি বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশের নিচে। এ বিষয়ে গড় পাসের হার ৬১ দশমিক ১৪ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে রাজশাহী বোর্ডে ৫৬ দশমিক ১ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৪ দশমিক ৮৩, যশোরে ৫৪ দশমিক ৯৫, চট্টগ্রামে ৬৫ দশমিক ৭৭, বরিশালে ৫৪ দশমিক ০৮, সিলেটে ৬৫ দশমিক ৮৪, দিনাজপুরে ৫৬ দশমিক ৫ এবং ময়মনসিংহে ৫৯ দশমিক ১১ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করেছেন।
আইসিটিতে গড় পাসের হার ৭১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৪ দশমিক ৭৪, কুমিল্লায় ৭৩ দশমিক ০১, যশোরে ৬৭ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রামে ৭৩ দশমিক ৩৬, বরিশালে ৬৬ দশমিক ৪২, সিলেটে ৭৪ দশমিক ২০, দিনাজপুরে ৭২ দশমিক ৬৪ এবং ময়মনসিংহে ৭১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
জানতে চাইলে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে দক্ষ শিক্ষকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজিভীতিও আছে। আর আইসিটি পড়ানোর জন্য যে মানের শিক্ষক প্রয়োজন, সেই মানের শিক্ষক নেই। অনেক অধ্যায় আছে, যা অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পড়ানো সম্ভব নয়। তাই দ্রুত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।’
মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪২ শতাংশ
বিভাগভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে রয়েছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ বিভাগে ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৩৫ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩১১ জন। বিভাগটিতে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৮৪ হাজার ৮৬৪ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞান বিষয়েও তুলনামূলক খারাপ ফল করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে চারটি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে। বোর্ডগুলো হলো রাজশাহী (৫২ দশমিক ৮৪ শতাংশ), বরিশাল (৫২ দশমিক ২০ শতাংশ), দিনাজপুর (৫৩ দশমিক ২ শতাংশ) এবং ময়মনসিংহ (৫৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ)। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
কড়াকড়ির প্রভাবও আছে
পরীক্ষার সময় কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরীক্ষা নেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি এবারের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘদিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকাও খারাপ ফলের অন্যতম কারণ।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘদিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এতে শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে। এ ছাড়া খাতা মূল্যায়ন ও পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবও পড়েছে ফলাফলে।









