নাটোরে খুনের মামলায় বিএনপির এমপির ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২) হত্যাকাণ্ডে নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে (৫০) হেফাজতে নিয়েছে ডিবি পুলিশ।
গতকাল সোমবার রাতে গুরুদাসপুরের ভাড়া বাসা থেকে তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
নাটোর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ শরীফুল হক এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, মিন্টুকে নাটোর ডিবি পুলিশ হেফাজতে রেখে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পেলে তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
ছাত্রদল নেতা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি দেশ জুড়ে আলোচনায় থাকায় নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিষয়টি দেখা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন এসপি।
এদিকে ছাত্রদল নেতা শাকিলের মৃত্যুর পর আজ মঙ্গলবার দুপুরে সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে তাঁর বাড়িতে যান। শাকিলের বাবা রবিউল করিম, তাঁর মা তশরী বেগম, স্ত্রী হাফসা শারমিন ও বোন শাকিলাকে সান্ত্বনা দেন। এ সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সংসদ সদস্য শাকিলের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
গতকাল সোমবার রাতে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তবে মরদেহ এখনো বাড়িতে পৌঁছায়নি। আজ বাদ আছর ঢাকায় জানাজা শেষে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে শাকিলের পরিবার।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, মরদেহ সন্ধ্যার আগে বা পরে বাড়িতে পৌঁছালে বাদ এশা গুরুদাসপুর সরকারি বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজসহ দলীয় ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত থাকবেন। পরে পুরানপাড়া কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
এই খুনের বিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রানা বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কালো ব্যাচ ধারণ, বিক্ষোভ সমাবেশ এবং আগামী শুক্রবার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দোয়া খায়েরসহ তিন দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি প্রকৃত খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান।
আজ দুপুরে শাকিলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে দলীয় নেতা-কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা মরদেহ আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। বাড়ির ভেতরে শাকিলের মা তশরী বেগম বিলাপ করছেন। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রতিবেশীরা। ঘরের ভেতর অনেকটা অচেতন হয়ে পড়ে আছেন স্ত্রী হাফসা শারমিন। আর ছোট বোন শাকিলা খাতুন পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পছন্দ করে শাকিলের সঙ্গে বিয়ে হয় হাফসা শারমিনের। বিয়ের মাস সাত মাস পরেই গত ১৪ অক্টোবর দুবৃর্ত্তদের হামলায় স্বামীকে হারালেন।
শাকিলের বাবা রবিউল করিম পেশায় রাজমিস্ত্রি শ্রমিক। নিজের শ্রমঘামে দুই ছেলে ও এক মেয়েকে বড় করেছেন। ছোট মেয়ে ও বড় ছেলে বিয়ে করায় সংসারের চাপ কিছুটা কমেছিল। তবে শাকিলকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল। শাকিলকে ঢাকা কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু পড়ালেখার খরচ চালাতে না পারায় পরে স্থানীয় একটি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি করান।
কলেজে পড়ালেখার সুবাদে ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন শাকিল। রাজমিস্ত্রি বাবা আক্ষেপ করে বলেন, রাজনীতি দেশ-দশের কল্যাণে হওয়া উচিত। কিন্ত সেই রাজনীতি
তাঁকে সন্তান হারা করেছে, একটি পরিবারকে সর্বস্বান্ত করেছে।
রবিউল করিম অভিযোগ করে বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে ছেলে আক্রান্ত হলেও দলের কোনো নেতা-কর্মী তাঁর বাড়িতে যায়নি। খোঁজখবর নেয়নি। এখন মৃত্যুর পর অনেক নেতা তাঁর বাড়িতে আসছেন।
শাকিলের বাবা আক্ষেপ করে বলেন, ছেলের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনাটি গত ১৪ অক্টোবর ঘটেছে। পাঁচ দিন পর (১৯ অক্টোবর) থানায় চার জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু থানা-পুলিশ এজাহারে থাকা নামগুলো বাদ দিয়ে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা নেয়।
এজাহার গ্রহণের ১২ দিন পরও কোনো আসামিকে গেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। দলীয় নেতা-কর্মীরাও মামলার অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখেনি। এ কারণে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত তিনি। রবিউল করিম বলেন, ‘এখন ছেলের মৃত্যুর পর দলের নেতা-কর্মীরা সরব। বিচার চাইব কার কাছে?’
সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে ও যুবদল নেতা নুরুজ্জামান মিন্টু আটকের খবরে খুশি হতে পারেননি রবিউল করিম। কারণ তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। বাবার ও দলীয় প্রভাবে তিনি পার পেয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা রবিউল করিমের।
তিনি আরও বলেন, এমপির ছেলে বলে কথা নয়। ছেলে হত্যার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক পুলিশ সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক। এমপির ছেলে জড়িত থাকলে তাঁকেও আসামি করার দাবি জানান তিনি।
শাকিলের বাবার এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, অপরাধী তাঁর ছেলে হলেও কোনো আপত্তি নেই তাঁর। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে আছেন এবং থাকবেন। শাকিলের চিকিৎসা ব্যয়সহ সবধরেনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। তা ছাড়া ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তারে পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
আসামিদের নাম পরিবর্তন ও কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করতেই বিলম্ব হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ওসি আরও বলেন, এমপিপুত্রের নাম আলোচনায় আসায় তাঁকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
সেদিন যা ঘটেছিল
গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পড়া সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন ছাত্রদল নেতা শাকিল। তাঁকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে করে তারা পালিয়ে যায়।
সেদিন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে শাকিল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, চাঁচকৈড় বাজার থেকে রাত ৯টার দিকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পথে বাজারপাড়া এলাকার নুর একাডেমির কাছে পৌঁছালে হেলমেট পড়া দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি থেকে বাঁচতে তিনি দৌড় দেন। গুলিটি গায়ে না লাগায় দুর্বৃত্তরা তাঁর পিছু ধাওয়া করে।
তিনি বলেন, পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির কাছে এলে দুর্বৃত্তরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন। এ সময় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চিৎকার করছিলেন। চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসার আগেই মোটরসাইকেল নিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান বলেন, বাজার পাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পর পর দুটি গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। এগিয়ে যেতেই ছাত্রদল নেতা শাকিল দৌড়াতে দেখেন। পেছনে মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া করছিল দুই ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের ফিরে যেতে দেখেন তিনি। এ সময় শহীদা দলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে চিৎকার করছিলেন শাকিল। পরে তিনিসহ স্থানীয়রা শাকিলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।










