Ajker Patrika

ত্রিশাল মহিলা বিপণিকেন্দ্রের দোকান বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ, রাজস্ববঞ্চিত পৌরসভা

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি  
আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ১৫: ৩৬
ত্রিশাল মহিলা বিপণিকেন্দ্রের দোকান বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ, রাজস্ববঞ্চিত পৌরসভা
ত্রিশাল পৌরসভার চকবাজার এলাকায় মহিলা বিপণিকেন্দ্র। ছবি: আজকের পত্রিকা

নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে একসময় ত্রিশাল পৌরসভার চকবাজার এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল মহিলা বিপণিকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নারী উদ্যোক্তার সংকট দেখা দিলে দোকানগুলো নিম্ন আয়ের সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দুই দশক ধরে এসব দোকানের বিপরীতে পৌরসভার কোষাগারে দোকানপ্রতি মাসে মাত্র ৩০০ টাকা জমা হলেও ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে আদায় করা হতো ২ হাজার ৫০০ টাকা করে। এতে একদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতারিত হয়েছেন, অন্যদিকে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে পৌরসভা।

ত্রিশাল পৌরসভা সূত্র ও সরেজমিন জানা যায়, বিপণিকেন্দ্রে শুরুতে ছয়টি এবং পরে আরও দুটি যুক্ত হয়ে বর্তমানে মোট আটটি দোকান রয়েছে। এসব দোকানে চা-স্টল, কাঁচামালের দোকান, ওষুধের দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্টের আগে দোকানগুলোর ভাড়া আদায় করতেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। পরে পৌরসভার বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম এবং পরবর্তী সময়ে প্রধান সহকারী এছহাক আলী দোকানপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া আদায় করেন। তবে পৌরসভার হিসাবে জমা হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা করে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের উচ্ছেদ করে নতুনভাবে দোকান বরাদ্দ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, গত কয়েক মাসে পুরোনো দোকানদারদের একাধিকবার দোকান ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়। গত বছরের ৩ জুলাই প্রথম নোটিশ এবং চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি সর্বশেষ নোটিশ দেওয়া হয়। পরে ১৮ জানুয়ারি পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী সেনাবাহিনীর সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযানে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে অভিযান সম্পন্ন না করেই ফিরে আসেন।

সে সময় দোকানদারেরা দোকান ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে পৌরসভার কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, কোনো ধরনের রসিদ ছাড়াই প্রতি মাসে দোকানপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করে সংসার চালিয়ে আসছিলাম। নিয়মিত ভাড়া দেওয়ার পরও হঠাৎ করে দোকান ছাড়ার নোটিশ পেয়ে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি। ব্যবসার জন্য অনেকের কাছে দেনা রয়েছে। এখন দোকান ছাড়তে বাধ্য হলে পাওনা টাকাও আদায় করতে পারব না। হঠাৎ করে কর্মহীন হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলব, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।’

পরে পুরোনো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনার পর নিয়মের মধ্যে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে তখন ব্যবসায়ীরা দোকানের সামনেই তাঁদের মালামাল নিয়ে বসে বেচাকেনা চালিয়ে আসছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, এরপর দোকান বরাদ্দের জন্য পরপর তিনবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার ‘অজুহাতে’ পরে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের ‘সক্ষমতার ভিত্তিতে’ কম টাকায় দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের দাবি, আটটি দোকানের মধ্যে দুটি দরপত্রের মাধ্যমে দোকানপ্রতি এককালীন অফেরতযোগ্য ছয় লাখ টাকা জামানত এবং মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাড়ার শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি দোকানগুলোর জন্য দোকানপ্রতি তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পাঁচটি দোকানের জন্য এক লাখ টাকা করে এবং একটি দোকানের জন্য দেড় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেওয়া হয়েছে।

দোকান না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক যুবদল নেতা হুমায়ুন কবির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘১৭ বছরের আন্দোলন, মামলা-হামলা ও জেল-জুলুমের পুরস্কার হিসেবে প্রশাসন ও নেতারা আমার পেটে লাথি দিল। জানি বিচার পাব না, তবুও কষ্ট থেকে কথাগুলো বললাম।’

দোকানবঞ্চিত ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা, ছফির উদ্দিন ও ওয়াদুদ বলেন, ‘আমরা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে ব্যবসা করছি। নিয়মিত ভাড়া দিলেও কখনো রসিদ পাইনি। এখন হঠাৎ করে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। যদি জানতাম নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তাহলে আমরাও আবেদন করে দোকান নেওয়ার চেষ্টা করতাম।’

পৌর বাজার পরিদর্শক রাজিবুল ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ছয় মাসের ভাড়া দোকানপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আমি আদায় করে জমা দিয়েছি। পৌরসভা কত টাকা পাওয়ার কথা ছিল বা বাকি টাকা কোথায় গেছে, তা আমার জানা নেই। পরে আমাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।’

পৌরসভার প্রধান সহকারী এছহাক আলী বলেন, ‘আমি ভাড়া আদায় করেছি, তবে এখনো জমা দিইনি। দ্রুত জমা দেওয়া হবে। আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দোকানপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকা পৌরসভায় জমা হতো।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা নওশীন আহমেদ মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে পৌর প্রকৌশলী ও প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

সদ্য বিদায়ী পৌর প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার দেবনাথ বলেন, ‘দোকানপ্রতি ৩০০ টাকা জমা হতো। বাকি টাকা কে নিত, সেটা সবাই জানে। বরাদ্দের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না বললে ভুল হবে, তবে বিষয়টি এমনই। বিদায়ের শেষ কার্যদিবসে ফাইলে স্বাক্ষর করেছি।’

বর্তমান পৌর প্রকৌশলী লুৎফুল ইসলাম বলেন, ‘আটটি দোকানের মধ্যে দুটি আগে থেকেই দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ ছিল। বাকি ছয়টি দোকানের জন্য তিনবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও সাড়া না পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে সক্ষমতার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাঁচটি দোকানের জন্য এক লাখ টাকা করে এবং একটি দোকানের জন্য দেড় লাখ টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে আমার জানা নেই।’

পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অনেক চেষ্টা করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। পূর্বে কী হয়েছে, তা আমি জানি না। নিয়ম মেনে দরপত্র ও সক্ষমতার ভিত্তিতে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আদায়কৃত টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে। কেউ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে থাকলে তা কার কাছে দিয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত