Ajker Patrika

মৌলভীবাজারে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘিরে করাতকলের ছড়াছড়ি, উজাড় হচ্ছে বন

মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজারে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘিরে করাতকলের ছড়াছড়ি, উজাড় হচ্ছে বন
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে কৃষিজমি ভরাট করে স্থাপন করা হয়েছে করাতকল। ছবি: আজকের পত্রিকা

৫৩ হাজার ১০৯ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল আর পাহাড়ঘেরা মৌলভীবাজারে করাতকলের ছড়াছড়ি। বৈধ করাতকলের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অবৈধ করাতকল, যেখানে দিন-রাত চেরা হচ্ছে সামাজিক বনায়ন ও বন থেকে চোরাই পথে কেটে আনা গাছ। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কৃষিজমিতেও স্থাপন করা হচ্ছে করাতকল। ফলে একদিকে উজাড় হচ্ছে বন, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ।

সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, সময় যত গড়াচ্ছে, করাতকলে অবৈধ গাছ চেরাইয়ের সংখ্যাও ততই বাড়ছে। অনেক করাতকলে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা গাছ চেরাই করে দেওয়া হয়। বন ও সড়কের পাশ থেকে গাছ চুরি করে কোনোভাবে করাতকলে পৌঁছাতে পারলেই তা যেন বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। ফলে নির্বিচারে গাছ কাটার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

জেলার পরিবেশ কর্মীরা বলেন, অবাধে গাছ নিধন করার জন্য একমাত্র বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর দায়ী। তারা যদি যত্রতত্র করাতকলের ছাড়পত্র ও লাইসেন্স অনুমোদন না দিতেন তাহলে বনগুলো বেঁচে থাকত। পরিবেশের ক্ষতি হতো না। এ জেলায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনের মূল্যবান গাছ প্রতিদিন চুরি হচ্ছে। চুরি হওয়া গাছগুলো করাতকলেই নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে দু-একটি অভিযান করা হলেও তা যথেষ্ট নয়।

সিলেট বিভাগীয় বন অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত হিসেবে মৌলভীবাজার জেলায় মোট ১৯৩টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে ১৪২ টির লাইসেন্স রয়েছে। অবৈধ ১৩টি এবং উচ্চ আদালতে রিট ও স্বত্ব মামলায় রয়েছে আরও ৪০টি করাতকল।

সরেজমিনে জেলার কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা ঘুরে দেখা যায় সংরক্ষিত বন ও সড়কের পাশে অসংখ্য করাতকল রয়েছে। এসব করাতকলে বৈধ ও অবৈধ গাছ নিয়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সময় ও সুযোগ বুঝে সেগুলো বিক্রি করা হয়। বেশিরভাগ করাতকল কৃষি জমি ভরাট করে স্থাপন করা হয়েছে। রাতের আঁধারেও অনেক করাতকলে গাছ চেরাই হয়, যাতে চোরাই গাছ কেউ দেখতে না পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন সড়কের পাশের গাছ, চা বাগানের ছায়া বৃক্ষগুলো অবাধে বিক্রি হচ্ছে। বৃক্ষ নিধনের কারণে সংরক্ষিত বনের ঘনত্ব কমেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, সড়কের পাশ থেকে অনেকেই গাছ চুরি করে করাতকলে নিয়ে আসেন। বৈধ গাছের সঙ্গে চোরাই গাছও বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে গাছ করাতকলে চেরার পর আর বোঝা যায় না কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ। অবৈধ করাতকলগুলো চালু রাখার জন্য মালিকেরা বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন করাতকলের মালিকেরা জানান, অবৈধভাবে অনেক করাতকলই চালাচ্ছেন। আবার অনেকেই আছেন আদালতে রিট করে চালাচ্ছেন। বন বিভাগ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও অবৈধ করাতকলের মালিকেরা তাদের ম্যানেজ করেই চলেন।

পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় অসংখ্য অবৈধ করাতকল রয়েছে। এসব করাতকল থেকে বন বিভাগের লোকেরা নিয়মিত টাকার ভাগ নেন। এ জন্য কিছু বলেন না। প্রতিনিয়ত গাছ চুরি হচ্ছে, এসব গাছ কোথায় যায়? পরিবেশকে বাঁচাতে হলে প্রথমে অবৈধ করাতকল বন্ধ করতে হবে।’

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের জনবল নেই। এ জন্য অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও লাইসেন্স বন বিভাগ থেকে দেওয়া হয়।’

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘মৌলভীবাজারে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু লাইসেন্সবিহীন করাতকল বন্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি কমলগঞ্জে একটি অবৈধ করাতকল বন্ধ করা হয়েছে। যাদের কাগজপত্র আছে তাদের প্রতি বছর নবায়ন করতে হবে। যে সব করাতকলের লাইসেন্স নেই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আবদুর রহমান আরও বলেন, ‘এই জেলায় অনেক সংরক্ষিত বন রয়েছে। অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা ও সিলগালা করা হয়। অনেক করাতকল উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। কেউ যদি চোরাই কাঠ বিক্রি বা চেরাই করে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত